ওয়াশিংটন, ৩০ মে (আইএএনএস): ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য একটি চুক্তি নিয়ে প্রায় দুই ঘণ্টার সিচুয়েশন রুম বৈঠক শেষে কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বৈঠকের পরেও হোয়াইট হাউস থেকে এ বিষয়ে স্পষ্ট কোনও ইঙ্গিত দেওয়া হয়নি বলে বিভিন্ন মার্কিন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
বৈঠকের আগে ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি দীর্ঘায়িত করা, হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া এবং তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার পথ সুগম করার লক্ষ্যে প্রস্তাবিত একটি চুক্তি সম্পর্কে তিনি “চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত” নেবেন।
তবে বৈঠক শেষে হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা শুধু জানান যে আলোচনা প্রায় দুই ঘণ্টা স্থায়ী হয়েছে। একইসঙ্গে তিনি প্রশাসনের পুরনো অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, ইরানকে কখনওই পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হতে দেওয়া হবে না।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রস্তাবিত সমঝোতা স্মারকে বর্তমান যুদ্ধবিরতি আরও ৬০ দিন বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে ওয়াশিংটন ও তেহরান একটি বৃহত্তর চুক্তির খুঁটিনাটি নিয়ে আলোচনা চালাবে, যার মধ্যে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদের ভবিষ্যৎও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বৈঠকের আগে ট্রাম্প কয়েকটি শর্তও তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া, জলপথ থেকে মাইন অপসারণ, কখনও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার অঙ্গীকার এবং উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম যুক্তরাষ্ট্রকে অপসারণ বা ধ্বংস করার অনুমতি দেওয়া।
অন্যদিকে, ইরান স্পষ্ট করেছে যে আলোচনা এখনও সম্পূর্ণ হয়নি। দেশটির বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানান, তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে যোগাযোগ অব্যাহত থাকলেও এখনও কোনও সমঝোতা স্মারক চূড়ান্ত হয়নি।
খবরে বলা হয়েছে, মার্কিন প্রস্তাবের একাধিক শর্ত নিয়ে ইরানের আপত্তি রয়েছে। পাশাপাশি তেহরানের কট্টরপন্থী গোষ্ঠীগুলির অভ্যন্তরীণ বিরোধিতাও চুক্তির পথে বড় বাধা হয়ে রয়েছে।
তবুও দুই পক্ষের কর্মকর্তাদের বক্তব্যে ইঙ্গিত মিলেছে যে আলোচনা এখনও চলমান। ইরান তাদের জব্দ হয়ে থাকা সম্পদ মুক্ত করা এবং অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার দাবি তুলেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক কার্যকলাপ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগের সমাধান চায়।
প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা মনে করছেন, দুই দেশ চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে। তবে ইরানের জব্দকৃত অর্থ মুক্ত করার মতো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনও অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে হরমুজ প্রণালী। বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই কৌশলগত জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়, যা পারস্য উপসাগরকে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত করে।
এদিকে, ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নৌ শাখা দাবি করেছে যে শুক্রবার তারা হরমুজ প্রণালীর কাছে চারটি জাহাজকে সতর্কবার্তা হিসেবে গুলি ছুড়েছে। তাদের অভিযোগ, জাহাজগুলি পূর্বানুমতি ছাড়াই জলপথ অতিক্রমের চেষ্টা করছিল।
পরিস্থিতির অর্থনৈতিক গুরুত্বও অত্যন্ত বেশি। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, বিশ্বব্যাংক গোষ্ঠী এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার শীর্ষ কর্তারা সতর্ক করেছেন, হরমুজ প্রণালীতে দীর্ঘমেয়াদি বিঘ্ন ঘটলে জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বড় ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকার ইঙ্গিতে আর্থিক বাজারে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। তেলের দাম কমেছে এবং মার্কিন শেয়ারবাজারে ঊর্ধ্বগতি লক্ষ্য করা গেছে। বিনিয়োগকারীরা আশা করছেন, আলোচনার মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত স্বাভাবিক নৌপরিবহন ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে।
এছাড়া মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, তেহরানের ওপর চাপ বাড়ানোর অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ১০০ কোটি ডলারের ইরানি ক্রিপ্টোকারেন্সি সম্পদ জব্দ করেছে।
উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং ইরান-কে ঘিরে কয়েক মাস ধরে চলা সংঘাতের পর এই আলোচনা শুরু হয়েছে। ওই সংঘাত বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধের আশঙ্কা বাড়ানোর পাশাপাশি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও অস্থিরতা সৃষ্টি করেছিল।



















