ঢাকা, ৩০ মে (আইএএনএস): বাংলাদেশে শিশুদের বিরুদ্ধে অপরাধের ক্ষেত্রে অপরিচিতদের তুলনায় পরিচিত মানুষদের জড়িত থাকার প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে বলে এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন, শিক্ষক এবং ঘনিষ্ঠ পরিচিতদের থেকেই শিশুদের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি তৈরি হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে।
সম্প্রতি দুটি নৃশংস ঘটনার পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। গত ১৯ মে ঢাকার পল্লবী এলাকায় আট বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ। পরে প্রতিবেশীর বাড়ি থেকে তার মুণ্ডবিহীন দেহ উদ্ধার হয়।
অন্যদিকে নেত্রকোনা জেলায় ১১ বছরের এক শিশুকে নৃশংস যৌন নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে বলে অভিযোগ। ওই শিশুটি বর্তমানে সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা।
বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্র ‘দ্য ডেইলি স্টার’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ঘটনাগুলি বিচ্ছিন্ন নয়, বরং নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান সহিংসতার বৃহত্তর প্রবণতার অংশ।
শিশু অধিকার সংস্থা ‘শিশুরাই সব’-এর মার্চ মাসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ২০২৫ সালের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ঘটনার বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রতি ১০ জন অপরাধীর মধ্যে ৯ জনই ভুক্তভোগীর পরিচিত।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নথিভুক্ত ধর্ষণের ৪০.৫৮ শতাংশ ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ছিলেন প্রতিবেশীরা। মোট ৩০৮টি ঘটনার মধ্যে ১২৫টির সঙ্গে প্রতিবেশীদের যোগসূত্র পাওয়া গেছে। এছাড়া ২১.৪৩ শতাংশ ক্ষেত্রে পরিচিত ব্যক্তি, ১৪.৬১ শতাংশ ক্ষেত্রে শিক্ষক বা ধর্মীয় শিক্ষক এবং ১৩.৬৪ শতাংশ ক্ষেত্রে ঘনিষ্ঠ আত্মীয়রা অভিযুক্ত ছিলেন।
অপরদিকে, অপরিচিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের হার ছিল মাত্র ৯.৭৪ শতাংশ।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, শিশু হত্যার ৬৬.১২ শতাংশ এবং যৌন নির্যাতনের ৫৯.০৯ শতাংশ ঘটনা ঘটেছে বাড়ি বা পারিবারিক পরিবেশের মধ্যেই।
‘শিশুরাই সব’-এর আহ্বায়ক লায়লা খোন্দকার বলেন, “আন্তর্জাতিক এবং স্থানীয় অভিজ্ঞতা বলছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শিশুদের নির্যাতন করেন পরিবারের সদস্য, শিক্ষক, প্রশিক্ষক বা প্রতিবেশীর মতো পরিচিত ব্যক্তিরা। বাংলাদেশে এই ধরনের অপরাধের পেছনের মনস্তত্ত্ব এবং সামাজিক নিষ্ঠুরতার কারণ নিয়ে জরুরি ভিত্তিতে গবেষণা প্রয়োজন।”
এদিকে, ঢাকাভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত চার মাসের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, পরিচিত বয়সের ৮১ জন ধর্ষণ-নির্যাতনের শিকার ব্যক্তির মধ্যে ৫৬ জনই ছিল ০ থেকে ১২ বছর বয়সি শিশু।
একই সময়ে নিহত ১১৫ শিশুর মধ্যে ৬৩ জনের বয়সও ছিল ০ থেকে ১২ বছরের মধ্যে, যা অল্পবয়সি শিশুদের ঝুঁকির মাত্রা স্পষ্ট করে।
‘শিশুরাই সব’-এর প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে শিশু ধর্ষণের প্রায় ১০ শতাংশ ক্ষেত্রে প্রমাণ নষ্ট করার উদ্দেশ্যে ভুক্তভোগীকে হত্যা করা হয়েছে।
শুধু চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিলের মধ্যেই ধর্ষণের পর ১১ জন শিশুকে হত্যার ঘটনা নথিভুক্ত করেছে আসক।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সুমাইয়া ইকবাল বলেন, “অনেক অপরাধী প্রাথমিক সাক্ষীকে সরিয়ে দিতে ভুক্তভোগীকে হত্যা করে। আমরা একে ‘উইটনেস এলিমিনেশন’ বলি। প্রমাণ লোপাটের উদ্দেশ্যেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটে।”
তিনি আরও বলেন, “শাস্তির নিশ্চয়তা ও ধারাবাহিকতা না থাকলে অপরাধ দমনে ভীতি তৈরি হয় না। পাশাপাশি নারী ও শিশুদের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি এবং যৌন বস্তুকরণের মতো গভীর সামাজিক সমস্যাও এই ধরনের সহিংসতার পরিবেশ তৈরি করে।”



















