আগরতলা, ২৭ মে: ত্রিপুরার বিখ্যাত জিআই-স্বীকৃত ‘কুইন আনারস’-কে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিষ্ঠিত করতে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার যৌথভাবে শুরু করল ২৩৬ কোটি টাকার উচ্চাভিলাষী ‘মিশন কুইন আনারস, ত্রিপুরা’ প্রকল্প। তিন বছর মেয়াদি এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য রাজ্যের কৃষকদের আয় বৃদ্ধি, আনারস চাষের আধুনিকীকরণ এবং কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করে তোলা।
বুধবার নতুন দিল্লিতে আয়োজিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি এই প্রকল্পের সূচনা করেন কেন্দ্রীয় ডোনার ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী জ্যোতিরাদিত্য এম সিন্ধিয়া। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর ডা. মানিক সাহা এবং কৃষি ও কৃষক কল্যাণ মন্ত্রী রতন লাল নাথ।
অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালভাবে যোগদানকারী আনারস চাষী, প্রক্রিয়াজাতকারী এবং বিনিয়োগকারীসহ অংশীজনদের উদ্দেশে শ্রী সিন্ধিয়া বলেন, “প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর দূরদৃষ্টির অধীনে ত্রিপুরার কৃষি শক্তি বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতামূলক ব্র্যান্ডে রূপান্তরিত হচ্ছে।”
কেন্দ্রীয় মন্ত্রী আরো উল্লেখ করেন যে, এর উদ্দেশ্য কেবল ফসল চাষ করা নয়, বরং কৃষকদেরকে উৎপাদন ও সংগ্রহ থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াজাতকরণ, ব্র্যান্ডিং, প্যাকেজিং এবং রপ্তানি পর্যন্ত সমগ্র মূল্য শৃঙ্খল জুড়ে সক্রিয় অংশীদার হতে সক্ষম করা।
মিশনের বৃহত্তর দৃষ্টিভঙ্গির উপর জোর দিয়ে শ্রী সিন্ধিয়া বলেন, “আমাদের লক্ষ্য হলো খামার থেকে বিশ্ববাজার পর্যন্ত একটি সম্পূর্ণ মূল্য শৃঙ্খল গড়ে তোলা, যাতে কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের মাধ্যমে সৃষ্ট সমৃদ্ধিতে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী হয়ে উঠেন।”
মিশনের অধীনে প্রধান পরিকাঠামোগত উপাদানগুলো তুলে ধরে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বলেন, এই কর্মসূচির আওতায় একটি “হাব অ্যান্ড স্পোক” সমন্বিত আনারস ফসল-পরবর্তী ইকোসিস্টেম প্রতিষ্ঠা করা হবে। এর মধ্যে থাকবে আগরতলা বিমানবন্দরের কাছে একটি কেন্দ্রীয় হাব এবং পশ্চিম ত্রিপুরা, খোয়াই ও সিপাহিজলা জেলার প্রধান আনারস উৎপাদনকারী এলাকাগুলোতে আটটি স্পোক সংগ্রহ কেন্দ্র। এই পরিকাঠামোর মধ্যে থাকবে গ্রেডিং সুবিধা, কোল্ড স্টোরেজ, রিফার লজিস্টিকস, সোলার কোল্ড স্টোরেজ, আইওটি-সক্ষম খামার পর্যবেক্ষণ এবং ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটি সিস্টেম।
মন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন যে, বেসরকারি অংশীদারদের সঙ্গে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে নেরাম্যাক কর্তৃক বাস্তবায়িত একটি ভায়াবিলিটি গ্যাপ ফান্ডিং মডেলের মাধ্যমে নালকাটা আনারস প্রক্রিয়াকরণ ইউনিটটি পুনরুজ্জীবিত করা হবে। এই কেন্দ্রটি আনারস-ভিত্তিক পণ্যের বাণিজ্যিক পর্যায়ে প্রক্রিয়াকরণ এবং মূল্য সংযোজনে সহায়তা করবে।
মিশনের জৈব-অর্থনীতি কৌশলের কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন যে, বর্তমানে বর্জ্য হিসেবে ফেলে দেওয়া আনারস গাছের প্রায় ৬০ শতাংশ ব্রোমেলিন নিষ্কাশন, আনারস পাতার আঁশ প্রক্রিয়াকরণ এবং জিআই-ব্র্যান্ডেড মূল্য সংযোজিত পণ্যে রূপান্তরিত করা হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, এই উদ্যোগগুলো নারী স্বনির্ভর গোষ্ঠী, আদিবাসী সম্প্রদায় এবং গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করবে এবং একই সাথে আনারস চাষকে ঘিরে চক্রাকার অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে।
মুখ্যমন্ত্রী মানিক সাহা বলেন, ত্রিপুরার জিআই-ট্যাগপ্রাপ্ত কুইন আনারসকে কেন্দ্র করে এই বহুমুখী প্রকল্প রাজ্যের প্রক্রিয়াকরণ পরিকাঠামোকে আরও শক্তিশালী করবে, বাজার ব্যবস্থাকে সুসংহত করবে এবং কুইন আনারসকে বিশ্ববাজারে একটি স্বতন্ত্র ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করবে।
তিনি আরও বলেন, “ফসলের উৎপাদন ঘাটতি কমানো এবং রপ্তানির নতুন সুযোগ সৃষ্টি করার মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়ন ও কৃষকদের আয় বৃদ্ধিতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।” পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ‘অ্যাক্ট ইস্ট পলিসি’র ভূয়সী প্রশংসা করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, এই নীতির ফলে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কৃষিমন্ত্রী রতন লাল নাথ জানান, ত্রিপুরার প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকা পাহাড় ও টিলা অধ্যুষিত হওয়ায় এখানকার কৃষি-জলবায়ুগত পরিবেশ আনারস চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। রাজ্যে প্রধানত জনজাতি কৃষকদের দ্বারা কুইন ও কিউ জাতের আনারস চাষ করা হয়। ত্রিপুরার রাজ্যফল ‘কুইন আনারস’ তার অনন্য সুগন্ধ, সোনালি-হলুদ রং ও আঁশহীন গঠনের জন্য দেশ-বিদেশে বিশেষভাবে সমাদৃত।
মন্ত্রী জানান, মোট ২৩৬ কোটি টাকার প্রকল্পে কেন্দ্রীয় ডোনার মন্ত্রক দেবে ১৪৫ কোটি টাকা, কৃষি মন্ত্রক ৩০ কোটি, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্প মন্ত্রক ২৫ কোটি, এবং ত্রিপুরা সরকার দেবে ২০ কোটি টাকা। এছাড়াও আপেডা, শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রক, এমএসএমই মন্ত্রক এবং ভারতীয় কৃষি গবেষণা পরিষদ আর্থিক সহায়তা প্রদান করবে।
বর্তমানে ক্ষুদ্র কৃষকরা প্রতি কেজি আনারসের জন্য মাত্র ৬ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত মূল্য পান। অথচ প্রক্রিয়াজাত ও রপ্তানিযোগ্য কুইন আনারস আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি কেজি ৮০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হতে পারে। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে কৃষকদের আয়ে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি ঘটবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ত্রিপুরার কুইন আনারস ভিটামিন এ, বি ও সি এবং ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, পটাশিয়াম ও আয়রনের মতো খনিজ পদার্থে সমৃদ্ধ। ২০১৮ সালের ৩ জুন প্রথমবারের মতো দুবাইয়ে ত্রিপুরার কুইন আনারস রপ্তানি করা হয়। এরপর কাতার, ওমান ও বাংলাদেশেও এই আনারস রপ্তানি শুরু হয়। পাশাপাশি ক্যানজাত আনারস জার্মানি ও রাশিয়াতেও পাঠানো হয়েছে।
মন্ত্রী জানান, প্রকল্পটি মূলত তিনটি প্রধান অংশে বিভক্ত— চাষ ব্যবস্থাপনা, ফসলোত্তর ব্যবস্থাপনা ও প্রক্রিয়াকরণ, এবং ব্র্যান্ডিং ও বিপণন। এছাড়াও আনারসের পাতা থেকে ব্রোমেলেইন এনজাইম উৎপাদনের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে কৃষকেরা যেসব পাতা ফেলে দেন, সেগুলিকেই সম্পদে রূপান্তরিত করে ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পে ব্যবহারযোগ্য এনজাইম তৈরি করা হবে। পাশাপাশি আনারস থেকে বেকারি পণ্য উৎপাদন ও বিপণনের উদ্যোগও নেওয়া হবে। আনারস চাষিরা যে পাতাগুলো আজ আবর্জনা হিসেবে ফেলে দেন, সেই পাতার মূল্য ১,৪৮৩ কোটি টাকা এই প্রকল্প সেই আবর্জনাকে সম্পদে রূপান্তরিত করে, ব্রোমেলেইন এনজাইম উৎপাদন ও সরবরাহের কাজ করবে সরকার, যা আনারস থেকে সংগ্রহ করা হবে এবং এটি ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলোর কাছে বিক্রি করা হবে।
ডোনার সচিব সঞ্জয় জাজু তার সূচনা বক্তব্যে মিশনটির বাস্তবায়ন কাঠামো সম্পর্কে বিশদভাবে আলোচনা করেন এবং ত্রিপুরা কুইন আনারসের পূর্ণ অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্য একটি মিশন-মোড পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তার উপর আলোকপাত করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, ভারতের সবচেয়ে সুগন্ধি এবং কম আঁশযুক্ত আনারসের জাতগুলির মধ্যে অন্যতম হওয়া সত্ত্বেও, ক্ষুদ্র চাষিরা বর্তমানে খামার পর্যায়ে প্রতি কেজিতে মাত্র ৬ থেকে ১০ টাকা পান, অথচ প্রক্রিয়াজাত এবং রপ্তানিযোগ্য পণ্য দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে এর চেয়ে অনেক বেশি মূল্য পেতে পারে।
ডোনার সচিব সঞ্জয় জাজু আরো উল্লেখ করেন, এই মিশনের লক্ষ্য হলো এই খাতের প্রধান কাঠামোগত ঘাটতিগুলো, যেমন, ফসল-পরবর্তী ক্ষতি, সমন্বিত কোল্ড-চেইন পরিকাঠামোর অভাব, বাণিজ্যিক পর্যায়ের প্রক্রিয়াকরণ সুবিধার অনুপস্থিতি, দুর্বল ব্র্যান্ডিং এবং সীমিত কাঠামো, ক্রেতা-সংযোগ ব্যবস্থার মতো বিষয়গুলোকে পদ্ধতিগতভাবে সমাধান করা।
মিশনের কার্যক্রমের মধ্যে আরও অন্তর্ভুক্ত থাকবে জিআই অনুমোদন কর্মশালা, কিউআর-ভিত্তিক শনাক্তকরণ ব্যবস্থা, জিআই নগদীকরণ কাঠামো, ক্রেতা-বিক্রেতা বৈঠক, জৈব প্রত্যয়ন সহায়তা, রপ্তানি-প্রস্তুতিমূলক পদক্ষেপ এবং ২৭শে জুন আন্তর্জাতিক আনারস দিবস উপলক্ষে “ত্রিপুরা কুইন আনারস উৎসব”-এর মতো বার্ষিক প্রধান অনুষ্ঠান।
এই মিশনের লক্ষ্য হলো ত্রিপুরা কুইন আনারসকে একটি বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত প্রিমিয়াম ব্র্যান্ডে রূপান্তরিত করার পাশাপাশি রাজ্যজুড়ে টেকসই জীবনযাত্রা, কৃষক-নেতৃত্বাধীন মূল্য সৃষ্টি এবং রপ্তানিমুখী প্রবৃদ্ধিকে শক্তিশালী করা। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ডোনার ও ত্রিপুরা সরকারের উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের পাশাপাশি কৃষক, উদ্যোক্তা এবং অন্যান্য অংশীজনরা উপস্থিত ছিলেন।


















