কলকাতা, ৮ মে (আইএএনএস): পশ্চিমবঙ্গের ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট শাসনের পতনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রাম জমি আন্দোলনের দুই ঐতিহাসিক পর্ব। এই দুই আন্দোলনের মধ্য থেকেই উঠে আসা এক সময়ের তৃণমূল নেতা শুভেন্দু অধিকারী আজ রাজ্যের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায় রচনা করে বিজেপি শাসিত পশ্চিমবঙ্গের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হতে চলেছেন।
২০০৭ সালে হুগলি জেলার সিঙ্গুরে টাটা মোটরসের ছোট গাড়ি প্রকল্প এবং পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রামে ইন্দোনেশিয়ার সালিম গ্রুপের প্রস্তাবিত কেমিক্যাল হাব প্রকল্পকে ঘিরে শুরু হওয়া জমি আন্দোলন রাজ্য রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের সূচনা করে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নন্দীগ্রাম আন্দোলনই বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে জনমতের বড় মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
সেই সময় নন্দীগ্রাম আন্দোলনের দায়িত্বে ছিলেন তৎকালীন তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা ব্যানার্জির ঘনিষ্ঠ সহযোগী শুভেন্দু অধিকারী। সিঙ্গুর আন্দোলনের নেতৃত্বে সরাসরি থাকলেও নন্দীগ্রামের দায়িত্ব ছিল তাঁর কাঁধে। নন্দীগ্রামে প্রশাসনিক চাপ, পুলিশের ঘেরাও এবং সিপিআই(এম) ক্যাডার ঘিরে থাকা পরিস্থিতির মধ্যেও তিনি আন্দোলনকে সংগঠিত রাখেন। গ্রামবাসীদের একত্রিত করে প্রবেশপথ বন্ধ করে দেওয়া এবং বিভিন্ন বামপন্থী গোষ্ঠীর সমর্থন জোগাড় করার মাধ্যমে আন্দোলনকে টিকিয়ে রাখেন তিনি।
২০০৭ সালের ১৪ মার্চ পুলিশের গুলিতে ১৪ জনের মৃত্যু হয়, যা রাজ্যে ব্যাপক রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্ম দেয় এবং বামফ্রন্ট শাসনের পতনের সূচনা হিসেবে বিবেচিত হয়। এরপর ২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল-কংগ্রেস জোটে দাঁড়িয়ে তমলুক আসন থেকে বিপুল ভোটে জয়ী হন শুভেন্দু অধিকারী। ২০১৪ সালেও তিনি পুনরায় নির্বাচিত হন।
২০১৬ সালে নন্দীগ্রাম বিধানসভা আসন থেকে জয়ী হয়ে রাজ্যের পরিবহন মন্ত্রী হন তিনি। সেই সময় তিনি পরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকীকরণে বিশেষ করে ইলেকট্রিক বাস চালুর মতো উদ্যোগ নেন। তবে ২০১৯ সালের পর তৃণমূল নেতৃত্বের সঙ্গে তাঁর মতপার্থক্য বাড়তে থাকে, বিশেষ করে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া ঘিরে অসন্তোষ তৈরি হয়।
এরপর ২০২০ সালে রাজনৈতিক কৌশল সংস্থা আই-প্যাকের ভূমিকা নিয়েও মতবিরোধ তীব্র হয়। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে তিনি মন্ত্রিত্ব ও বিধায়ক পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে বিজেপিতে যোগ দেন। নন্দীগ্রাম আসন থেকে তিনি তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করে রাজনৈতিকভাবে বড় চমক সৃষ্টি করেন। ২০২১ সালের নির্বাচনে বিজেপি ৭৭টি আসন পেলে শুভেন্দু অধিকারী হন বিরোধী দলনেতা।
এরপর রাজ্যজুড়ে বিভিন্ন ইস্যুতে তিনি ধারাবাহিক আন্দোলন চালিয়ে যান। চাকরি দুর্নীতি, নারী নিরাপত্তা, এবং আর.জি. কর মেডিক্যাল কলেজে ঘটে যাওয়া ঘটনার মতো ইস্যুতে তিনি তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে সরব হন। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে পূর্ব মেদিনীপুর জেলায় বিজেপির বড় সাফল্যে তাঁর সংগঠনিক ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়।
সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি ২০৭টি আসনে জয়ী হয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে, যেখানে তৃণমূল কংগ্রেস নেমে আসে ৮০ আসনে। নন্দীগ্রাম ও ভবানীপুর এই দুই আসন থেকেই জয়ী হন শুভেন্দু অধিকারী এবং ভবানীপুরে তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পুনরায় পরাজিত করেন।
এরপরই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ তাঁর নামকে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় বিজেপি পরিষদীয় দলের নেতা হিসেবে চূড়ান্ত অনুমোদন দেন। ফলে রাজ্যের প্রথম বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শুভেন্দু অধিকারীর নামই কার্যত নিশ্চিত হয়ে যায়। নন্দীগ্রামের আন্দোলন নেতা থেকে শুরু করে দুইবার মুখ্যমন্ত্রীকে পরাজিত করা এই রাজনৈতিক যাত্রা এখন পশ্চিমবঙ্গ রাজনীতির অন্যতম ঐতিহাসিক অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।



















