নয়াদিল্লি, ৬ আগস্ট (আইএএনএস): ভারত শুধু পরিচ্ছন্ন জ্বালানি প্রযুক্তির অন্যতম বৃহৎ ভোক্তা নয়, বরং এই প্রযুক্তির বৈশ্বিক উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন কেন্দ্রীয় ইস্পাত ও ভারী শিল্পমন্ত্রী এইচ.ডি. কুমারস্বামী। তাঁর মতে, দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে কোনও দেশের শক্তি শুধু জ্বালানি সম্পদের ওপর নির্ভর করে না, বরং ভবিষ্যতের প্রযুক্তি উৎপাদন, উদ্ভাবন এবং শক্তিশালী সরবরাহ শৃঙ্খল গড়ে তোলার সক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল।
বৃহস্পতিবার নয়াদিল্লিতে সিআইআই-এর সপ্তম আন্তর্জাতিক জ্বালানি সম্মেলন ও প্রদর্শনী-র বিশেষ পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে কুমারস্বামী বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে ‘আত্মনির্ভর ভারত’-এর লক্ষ্যকে সামনে রেখে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি প্রযুক্তির ক্ষেত্রে ভারতকে বৈশ্বিক উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে। তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্বে শিল্প সক্ষমতা এবং জ্বালানি নিরাপত্তা একে অপরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।
তিনি জানান, সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তন, সরবরাহ শৃঙ্খলের বিঘ্ন এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজের জন্য বাড়তে থাকা প্রতিযোগিতা বিশ্ব শিল্পনীতির অগ্রাধিকার বদলে দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ভারত দেশীয় উৎপাদন শক্তিশালী করার পাশাপাশি বিশ্বস্ত আন্তর্জাতিক মূল্যশৃঙ্খলের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত থাকার কৌশল নিয়েছে।
কুমারস্বামী বলেন, সৌরবিদ্যুৎ পার্ক, বায়ু টারবাইন, বিদ্যুৎ সঞ্চালন নেটওয়ার্ক, ব্যাটারি উৎপাদন কেন্দ্র, বন্দর এবং গ্রিন হাইড্রোজেন প্রকল্প—সব ক্ষেত্রেই ইস্পাতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ইস্পাত উৎপাদক হিসেবে ভারত দেশের পরিকাঠামো ও উৎপাদন খাতের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি টেকসই ইস্পাতের বৈশ্বিক চাহিদাও মেটাতে সক্ষম।
তিনি ‘গ্রিন স্টিল’-এর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বলেন, কম-কার্বন নির্গমনভিত্তিক ইস্পাত উৎপাদন এখন শুধু পরিবেশগত প্রয়োজন নয়, অর্থনৈতিকভাবেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ লক্ষ্যে সরকার ইস্পাত শিল্পে নবীকরণযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার, শক্তি-সাশ্রয়ী প্রযুক্তি, সম্পদের দক্ষ ব্যবহার এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর উদ্যোগকে উৎসাহ দিচ্ছে।
ভারী শিল্পের প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বলেন, পরিচ্ছন্ন জ্বালানির রূপান্তর সফল করতে শুধু নবীকরণযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ালেই হবে না। উন্নত ব্যাটারি, ভারী বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, নির্মাণ যন্ত্রপাতি, অটোমোবাইল উৎপাদন এবং শক্তি সঞ্চয় ব্যবস্থাসহ সমগ্র শিল্প মূল্যশৃঙ্খলে দেশীয় উৎপাদন ক্ষমতা বাড়াতে হবে।
তিনি জানান, ১০,৯০০ কোটি টাকার পিএম ই-ড্রাইভ প্রকল্প শুধু বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার বাড়ানোর জন্য নয়, বরং সম্পূর্ণ শিল্প ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার লক্ষ্যেই নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ১৮,১০০ কোটি টাকার প্রোডাকশন লিঙ্কড ইনসেনটিভ প্রকল্পের মাধ্যমে ৫০ গিগাওয়াট-ঘণ্টা দেশীয় ব্যাটারি উৎপাদন ক্ষমতা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
গুরুত্বপূর্ণ খনিজের কৌশলগত গুরুত্বের কথা উল্লেখ করে কুমারস্বামী বলেন, বিরল মৃত্তিকা (রেয়ার আর্থ), উন্নত উপাদান এবং খনিজ প্রক্রিয়াকরণে দেশীয় সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও জোরদার করা হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে তিনি ৭,২৮০ কোটি টাকার সিন্টারড রেয়ার আর্থ পার্মানেন্ট ম্যাগনেট উৎপাদন প্রসার প্রকল্প-এর উল্লেখ করে বলেন, এটি অটোমোবাইল, প্রতিরক্ষা, নবীকরণযোগ্য জ্বালানি ও মহাকাশ শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ শৃঙ্খল শক্তিশালী করতে এবং আমদানিনির্ভরতা কমাতে বড় পদক্ষেপ।
শেষে তিনি বলেন, শক্তিশালী ও স্থিতিশীল সরবরাহ শৃঙ্খল গড়ে তুলতে শুধু সরকারি নীতিই যথেষ্ট নয়; সরকার, শিল্প, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গবেষণা সংস্থা এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আরও গভীর সমন্বয় গড়ে তোলা জরুরি।



















