রোম, ২০ সেপ্টেম্বর (আইএএনএস): ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) মধ্যে বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের দিকে এগিয়ে যাওয়ার মধ্যেই ভারত ও ইতালির দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও গুরুত্বপূর্ণ ও চ্যালেঞ্জিং পর্যায়ে প্রবেশ করছে বলে একটি রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। ‘ডিকোড৩৯’-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, রোমের জন ক্যাবট বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্প্রতি প্রথম ‘ট্র্যাক ১.৫’ সংলাপের আয়োজন করা হয়, যেখানে গত কয়েক বছরে ভারত-ইতালি সম্পর্কের পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
ভারত ও ইতালি ২০২৩ সালে কৌশলগত অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করে। ২০২৪ সালে দুই দেশ ২০২৫-২০২৯ সময়কালের জন্য একটি যৌথ কৌশলগত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করে। এরপর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মে মাসে ইতালি সফরের সময় দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে ‘বিশেষ কৌশলগত অংশীদারিত্ব’-এর পর্যায়ে উন্নীত করা হয়।
নতুন কাঠামোর আওতায় দুই দেশের বিদেশমন্ত্রীদের নেতৃত্বাধীন একটি ব্যবস্থা যৌথ কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করবে এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে কৌশলগত দিশা দেবে।
সম্প্রতি রোমে জন ক্যাবট বিশ্ববিদ্যালয়ের গুয়ারিনি ইনস্টিটিউট ফর পাবলিক অ্যাফেয়ার্সের উদ্যোগে প্রথম ভারত-ইতালি ‘ট্র্যাক ১.৫’ সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানের প্রকাশ্য পর্বে ইতালিতে ভারতের রাষ্ট্রদূত বাণী রাও উপস্থিত ছিলেন। ‘চ্যাথাম হাউস রুল’-এর আওতায় অনুষ্ঠিত আলোচনায় দুই দেশের সম্পর্কের পরিবর্তন নিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়। ২০২৭ সালে ভারত ও ইতালির মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের ৮০ বছর পূর্তি হবে।
রিপোর্টে বলা হয়েছে, ভারত ও ইতালির অর্থনৈতিক সম্পর্কের সম্ভাবনা পরিকাঠামোগত সংযোগের চেয়েও অনেক বিস্তৃত। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য বাড়াতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলি আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। তবে শুল্ক-বহির্ভূত বাধা এবং নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার পার্থক্য দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক সংহতির ক্ষেত্রে এখনও চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রেও ভারত-ইতালি সম্পর্কের পরিধি বাড়ছে। বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে সামরিক কর্মী বিনিময়, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সংগ্রহ, গবেষণা ও উন্নয়ন এবং শিল্পক্ষেত্রে অংশীদারিত্ব রয়েছে। পাশাপাশি নৌবাহিনীর সফর ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতেও দুই দেশ অংশ নিচ্ছে।
ভারত ও ইতালি এমন একটি সামুদ্রিক অঞ্চলের দুই প্রান্তে রয়েছে, যা ইন্দো-প্যাসিফিক, মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপকে সংযুক্ত করে। এই অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও সামুদ্রিক রুটগুলির সুরক্ষা দুই দেশের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত। এই প্রেক্ষাপটে ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডর (আইএমইসি) গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
রিপোর্ট অনুযায়ী, ইতালির জন্য আইএমইসি ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে তার ক্রমবর্ধমান সম্পৃক্ততা এবং ঐতিহ্যবাহী ভূমধ্যসাগরীয় যোগাযোগের মধ্যে একটি ভৌগোলিক সংযোগ তৈরি করতে পারে। ভারতের জন্য এই করিডর উপসাগরীয় অঞ্চল ও ভূমধ্যসাগরের মাধ্যমে ইউরোপীয় বাজারের সঙ্গে যোগাযোগ আরও শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
ডিকোড৩৯-এর প্রতিবেদনে লেখক এমানুয়েল রসি উল্লেখ করেছেন, ২০২৭ সালে কূটনৈতিক সম্পর্কের ৮০তম বার্ষিকী এবং সাংস্কৃতিক পর্যটন বর্ষ দুই দেশের সম্পর্কের ভিত্তি আরও বিস্তৃত করার সুযোগ তৈরি করবে। আগামী বছর জন ক্যাবট বিশ্ববিদ্যালয়ে আরও বড় পরিসরে উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনার কথাও তিনি জানান।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বিশেষ কৌশলগত অংশীদারিত্ব, ২০২৯ সাল পর্যন্ত কার্যকর যৌথ কর্মপরিকল্পনা, ২০ বিলিয়ন ইউরোর বাণিজ্য লক্ষ্যমাত্রা, ক্রমবর্ধমান প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, ইউরোপীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি এবং আইএমইসির মতো উদ্যোগকে বাস্তব ফলাফলে পরিণত করাই এখন দুই দেশের সামনে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
১৭ সেপ্টেম্বর ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ৭৬তম জন্মদিনে তাঁকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, দুই দেশ তাদের ‘গভীর বন্ধুত্বের বন্ধন’ আরও শক্তিশালী করে সহযোগিতা ও সমৃদ্ধির ভবিষ্যৎ গড়ে তুলছে। প্রধানমন্ত্রী মোদি পাল্টা শুভেচ্ছার জন্য মেলোনিকে ধন্যবাদ জানিয়ে ভারত-ইতালির ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা অব্যাহত রাখার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
এর আগে চলতি মাসের শুরুতে মেলোনি ইতালির যুদ্ধ-পরবর্তী ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সময় ধরে দায়িত্ব পালনকারী প্রধানমন্ত্রী হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী মোদি তাঁকে অভিনন্দন জানান এবং তাঁর সাফল্য কামনা করেন। একই সঙ্গে দুই দেশের বিশেষ কৌশলগত অংশীদারিত্ব শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে মেলোনির প্রচেষ্টার প্রশংসা করেন তিনি।
মেলোনি জবাবে বলেন, ভারত ও ইতালির সম্পর্ক বর্তমানে আগের যেকোনও সময়ের তুলনায় আরও শক্তিশালী। দুই দেশের বিশেষ কৌশলগত অংশীদারিত্বকে তিনি পারস্পরিক সম্পর্কের গুরুত্ব এবং নতুন উন্নয়নের সুযোগ তৈরিতে দুই দেশের দক্ষতাকে একত্রিত করার অঙ্গীকার হিসেবে উল্লেখ করেন।
—আইএএনএস



















