ঢাকা, ১ সেপ্টেম্বর (আইএএনএস): বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে ভয়, হুমকি ও নিরাপত্তাহীনতা ক্রমশ বাড়ছে এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষার ঘাটতির কারণে পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে দেশের হিন্দুদের একটি বড় অংশ বাংলাদেশ ছেড়ে যেতে বাধ্য হতে পারেন বলে সতর্ক করেছেন আইনজীবী ও সংখ্যালঘু অধিকারকর্মী চৈতালী চক্রবর্তী।
বাংলাদেশি সংবাদপত্র ‘ব্লিটজ’-এর সম্পাদক সালাহউদ্দিন শোয়েব চৌধুরীকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী চক্রবর্তী বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে দেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য অবনতি হয়েছে।
চক্রবর্তী জানান, নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি শুধু হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, দেশের সাধারণ নাগরিকদের মধ্যেও তা ক্রমশ বাড়ছে। তবে ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে হিন্দুরা বাড়তি চাপের মুখে রয়েছেন। সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে সরব ব্যক্তিরাও ভয়ভীতি ও হুমকির শিকার হচ্ছেন বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি বলেন, “৫ আগস্ট থেকে আজ পর্যন্ত আমরা সত্যিই একটি অস্থিতিশীল পরিবেশের মধ্যে রয়েছি এবং আমাদের কোনও নিরাপত্তা নেই।”
বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক হিংসা ও সংখ্যালঘুদের উপর হামলার অভিযোগের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার কার্যকারিতা ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগের মধ্যেই চক্রবর্তীর এই মন্তব্য সামনে এসেছে।
রংপুর শহরে একটি হিন্দু পরিবারের চার সদস্যকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনা এবং তদন্ত নিয়ে ওঠা প্রশ্নের প্রসঙ্গও তোলেন তিনি। চক্রবর্তী বলেন, প্রতিশোধ বা হামলার আশঙ্কায় স্থানীয় বাসিন্দারা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পুলিশকে জানাতে ভয় পাচ্ছেন।
গত ২০ আগস্ট ওই ঘটনা ঘটে। পরে ২২ আগস্ট রাতে পুলিশ পরিবারের চার সদস্যের দেহ উদ্ধার করে। মৃতদের মধ্যে ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত রংপুর জিলা স্কুলের শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগমী চক্রবর্তী প্রার্থী (২৩) এবং ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তী (১২)।
চক্রবর্তী বলেন, হত্যাকাণ্ডের নৃশংসতা একটি নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি রাখে। তাঁর মতে, ঘটনাটি যেভাবে সংঘটিত হয়েছে, তাতে পরিকল্পিত ও সংগঠিত হামলার সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে এবং পেশাদার বা কোনও নির্দিষ্ট মতাদর্শে অনুপ্রাণিত অপরাধীদের সম্ভাব্য ভূমিকা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে সংখ্যালঘু অধিকারকর্মী বলেন, দীর্ঘমেয়াদে এর সবচেয়ে গুরুতর প্রভাব পড়তে পারে দেশের জনসংখ্যাগত ভারসাম্যে। তাঁর দাবি, লাগাতার হিংসা, ভয়ভীতি ও বৈষম্য বন্ধ না হলে বহু হিন্দু পরিবার নিজেদের পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হতে পারেন।
পরিস্থিতির ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে আগামী এক দশকের মধ্যে বাংলাদেশে হিন্দু জনসংখ্যা কার্যত নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
‘ব্লিটজ’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংখ্যালঘু অধিকারকর্মীদের দীর্ঘদিনের উদ্বেগ হল, সাম্প্রদায়িক হিংসার কারণে সবসময় একসঙ্গে ব্যাপক দেশত্যাগ ঘটে না। বরং দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তাহীনতা, সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ, সামাজিক ভয়ভীতি, অর্থনৈতিক চাপ এবং আতঙ্ক ধীরে ধীরে সংখ্যালঘু পরিবারগুলিকে দেশত্যাগের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
হিন্দুদের উপর নিপীড়ন ও ভয়ভীতির বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখার জন্য আন্তর্জাতিক আইনপ্রণেতা ও নীতিনির্ধারকদের কাছে আবেদন জানান চক্রবর্তী। যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের আইনপ্রণেতাদের বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করে সংখ্যালঘু নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য চাপ দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
—আইএএনএস


















