ওয়াশিংটন, ৮ জুলাই (আইএএনএস) : ভারতীয় পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ১২.৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের মার্কিন প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করল ভারত। মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির (ইউএসটিআর) সেকশন ৩০১-সংক্রান্ত শুনানিতে ভারত জানিয়েছে, এই তদন্তের কোনও শক্তিশালী আইনি বা বাস্তবভিত্তিক ভিত্তি নেই এবং প্রস্তাবিত শুল্ক কার্যকর হলে সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত হবে, অথচ জোরপূর্বক শ্রম (ফোর্সড লেবার) রোধের মূল উদ্দেশ্য পূরণ হবে না।
শুনানিতে ভারতের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রকের প্রতিনিধি ড. ব্রিজ মোহন বলেন, ভারতজুড়ে প্রায় সব ধরনের আমদানির ওপর ১২.৫ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের সুপারিশ করার ক্ষেত্রে ইউএসটিআর প্রয়োজনীয় আইনি মানদণ্ড পূরণ করতে পারেনি। পাশাপাশি, ভারতের নীতির কারণে মার্কিন বাণিজ্যের কোনও ক্ষতি হয়েছে, এমন প্রমাণও উপস্থাপন করা হয়নি।
তিনি বলেন, ইউএসটিআরের সুপারিশ মূলত সামগ্রিক বাণিজ্যিক প্রবণতার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু কোনও নির্দিষ্ট শিল্প বা পণ্যের ক্ষেত্রে ভারতীয় রপ্তানির সঙ্গে জোরপূর্বক শ্রমের সরাসরি সম্পর্ক দেখাতে পারেনি তারা।
ড. মোহন আরও বলেন, কোনও দেশে জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানির ওপর আলাদা নিষেধাজ্ঞা না থাকলেই তা ওই দেশ এমন শ্রমপ্রথাকে সমর্থন করে—এই যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁর মতে, জোরপূর্বক শ্রম নির্মূল করতে প্রতিটি দেশের বাস্তব পরিস্থিতি অনুযায়ী নীতি গ্রহণ করতে হয়, বিস্তৃত আমদানি নিষেধাজ্ঞা বা অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ তার সমাধান নয়।
তিনি আরও দাবি করেন, ইউএসটিআর ভারতের নিয়ন্ত্রক কাঠামো এবং মার্কিন বাণিজ্যের ক্ষতির মধ্যে কোনও প্রত্যক্ষ সম্পর্ক প্রমাণ করতে পারেনি। বরং ইউএসটিআরের নিজস্ব তথ্যেই দেখা যাচ্ছে, তামাক, চাল ও তুলার মতো ক্ষেত্রে ভারতে মার্কিন রপ্তানি বেড়েছে এবং তৃতীয় দেশের প্রতিযোগিতা কমেছে।
ভারতের মূল বক্তব্যের পর ওয়াশিংটনে ভারতীয় দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি (বাণিজ্য) শ্রেয়াংশ গুপ্ত কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য রপ্তানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (এপিডা)-র পক্ষে বক্তব্য রাখেন।
তিনি চাল আমদানির বিষয়ে ইউএসটিআরের পর্যবেক্ষণকে ভুল তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি বলে দাবি করেন। তাঁর বক্তব্য, ভারত বিশ্বের বৃহত্তম চাল উৎপাদক ও রপ্তানিকারক দেশ। দেশে আমদানি হওয়া চালের পরিমাণ অত্যন্ত সীমিত এবং তা মূলত বিশেষ ধরনের ভোক্তা চাহিদা পূরণের জন্য ব্যবহৃত হয়, রপ্তানির জন্য নয়।
তিনি জানান, ভারতের মোট চাল আমদানির প্রায় ৪৫ শতাংশ থাইল্যান্ড থেকে আসে, যা মূলত বিশেষ ধরনের জুঁই (জ্যাসমিন) চাল। এই চাল পুনরায় রপ্তানি করা হয় না এবং এটি মার্কিন উৎপাদিত চালের সঙ্গে প্রতিযোগিতাও করে না।
শ্রেয়াংশ গুপ্ত বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের রপ্তানিকৃত চালের বড় অংশই ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) স্বীকৃত বাসমতি চাল, যা নির্দিষ্ট ইন্দো-গাঙ্গেয় অঞ্চলে উৎপাদিত হয়। এছাড়া নন-বাসমতি চালও সম্পূর্ণ দেশীয় উৎপাদন থেকেই রপ্তানি করা হয়।
তাঁর দাবি, ভারতের চাল আমদানির মূল্য যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানিকৃত চালের মোট মূল্যের তিন শতাংশেরও কম। পাশাপাশি, আমদানিকৃত চালকে ভারতীয় চাল হিসেবে রপ্তানি করা রোধে কঠোর নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা রয়েছে।
তিনি আরও জানান, যুক্তরাষ্ট্রে চাল রপ্তানির অনুমতি শুধুমাত্র কৃষি ও কৃষক কল্যাণ মন্ত্রকের নিবন্ধিত রাইস মিলগুলিকেই দেওয়া হয়। এছাড়া বড় মার্কিন সুপারমার্কেট ও বেসরকারি ক্রেতাদের নির্ধারিত কঠোর শ্রমবিধিও ভারতীয় রপ্তানিকারকদের মেনে চলতে হয়।
শ্রেয়াংশ গুপ্ত ইউএসটিআরকে ভারতের বিরুদ্ধে চলমান তদন্ত প্রত্যাহার করার অথবা অন্তত ভারতীয় চালকে প্রস্তাবিত শুল্কের আওতার বাইরে রাখার আবেদন জানান।
শুনানিতে ভারতের শিল্প সংগঠনগুলিও অতিরিক্ত শুল্কের বিরোধিতা করে। ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ফিকি)-র প্রতিনিধি পূর্ণিমা শেনয় বলেন, জোরপূর্বক শ্রম নির্মূলের লক্ষ্যকে ভারতীয় শিল্প সমর্থন করে। তবে গোটা অর্থনীতির ওপর একযোগে শুল্ক চাপানো হলে নিয়ম মেনে চলা শিল্পগুলিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং মার্কিন ব্যবসা ও ভোক্তাদের ব্যয় বাড়বে।
কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রি (সিআইআই)-এর প্রতিনিধি শুচিতা সোনালিকা বলেন, ভারতে জোরপূর্বক শ্রম নিষিদ্ধ করার জন্য বিস্তৃত আইনি কাঠামো রয়েছে এবং ভারতীয় রপ্তানিকারকেরা আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের নির্ধারিত কঠোর মানদণ্ড মেনেই কাজ করেন। তাই শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপের পরিবর্তে পারস্পরিক সহযোগিতা ও নিয়মভিত্তিক সমাধানের পথ বেছে নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
উল্লেখ্য, জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানির বিরুদ্ধে বিভিন্ন দেশের পদক্ষেপ যথাযথ কি না, তা খতিয়ে দেখতে ইউএসটিআর সেকশন ৩০১ তদন্ত শুরু করেছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ওয়াশিংটনে আয়োজিত এই গণশুনানিতে বিভিন্ন দেশের সরকারি প্রতিনিধি, শিল্প সংগঠন, শ্রমিক সংগঠন এবং ব্যবসায়িক প্রতিনিধিরা নিজেদের বক্তব্য ও তথ্য তুলে ধরছেন।
























