ওয়াশিংটন, ১৮ জুন (আইএএনএস): ফ্রান্সে জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈঠক ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক বার্তা দিলেও, ভবিষ্যতে এই সম্পর্ক কতটা এগোবে তা নির্ভর করবে পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠনের ওপর। এমনটাই মত বিশ্লেষক, প্রাক্তন সরকারি আধিকারিক এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞদের।
জি-৭ সম্মেলনের সাইডলাইনে অনুষ্ঠিত মোদি-ট্রাম্প বৈঠককে ঘিরে নানা প্রতিক্রিয়া সামনে এসেছে। অনেকেই এই সাক্ষাৎকে নতুন করে সম্পর্ক মজবুত করার সুযোগ হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ কেউ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে বিদ্যমান টানাপোড়েনের বিষয়েও সতর্ক করেছেন।
গায়িকা ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার মেরি মিলবেন আইএএনএস-কে বলেন, “দুই নেতাকে আবার একসঙ্গে দেখতে পেয়ে খুব ভালো লেগেছে। এক বছরেরও বেশি সময় পরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং প্রধানমন্ত্রী মোদিকে একই কক্ষে দেখা গেল। এটি ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইতিবাচক এবং প্রতীকীভাবে একটি স্বাভাবিক পুনরারম্ভের ইঙ্গিত।”
তিনি বলেন, বৈঠকে ট্রাম্পের মন্তব্য আশাব্যঞ্জক ছিল। ট্রাম্প ভারতকে “আমেরিকার সবচেয়ে শক্তিশালী গণতান্ত্রিক মিত্র” এবং নিজেকে ভারতের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে উল্লেখ করেছেন বলে জানান মিলবেন।
তবে তিনি স্পষ্ট করে দেন যে, এই বৈঠকের প্রকৃত সাফল্য কথায় নয়, ভবিষ্যতের পদক্ষেপে নির্ধারিত হবে।
মিলবেন বলেন, “তিনি দেশে ফেরার পর কী পদক্ষেপ নেন, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। আমার আশা, এই সম্মেলনের পর ভারতের প্রতি মার্কিন নীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাবে।”
তিনি আরও বলেন, “প্রধানমন্ত্রী মোদি শীর্ষ সম্মেলনে যথার্থই বলেছেন, পারস্পরিক আস্থাই আজকের দিনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পদ। ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের ভবিষ্যৎ সেই আস্থা পুনর্গঠনের ওপরই নির্ভর করবে।”
অন্যদিকে, মার্কিন বাণিজ্য দপ্তরের প্রাক্তন সহকারী সচিব রেমন্ড ভিকারি তুলনামূলকভাবে সতর্ক মূল্যায়ন করেছেন। তিনি বলেন, গত ১৬ মাসে দুই দেশের সম্পর্কে এক ধরনের স্থবিরতা দেখা গিয়েছিল, সেই প্রেক্ষাপটে এই বৈঠক গুরুত্বপূর্ণ।
ভিকারি বলেন, “বৈঠক হওয়াটা অবশ্যই ভালো হয়েছে। দুই নেতার মধ্যে ইতিবাচক রসায়নও দেখা গেছে।”
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, “তিন দিনের একটি শীর্ষ সম্মেলনের শেষে মাত্র আধঘণ্টার বৈঠক দুই বৃহত্তম গণতন্ত্রের মধ্যে তৈরি হওয়া আস্থার সংকট দূর করতে পারবে না। এর জন্য দীর্ঘমেয়াদি প্রচেষ্টা এবং প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন প্রয়োজন।”
আলব্রাইট স্টোনব্রিজ গ্রুপের অংশীদার আত্মন ত্রিবেদীও একই ধরনের মত প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “এই বৈঠককে ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের পূর্ণাঙ্গ রিসেট বলা যাবে না। বরং অনেক ভারতীয় পর্যবেক্ষকের মধ্যে এখনও সংশয় রয়েছে।”
তবে তাঁর মতে, সাম্প্রতিক সময়ে ভারতীয় নাবিকদের মৃত্যুর ঘটনাকে ঘিরে ভারতে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল, এই বৈঠক তা কিছুটা হলেও প্রশমিত করতে সাহায্য করেছে।
শিক্ষা ও গবেষণা ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞরাও দুই দেশের সহযোগিতার সম্ভাবনার ওপর জোর দিয়েছেন।
জর্জ ম্যাসন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব কম্পিউটিং-এর ডিভিশনাল ডিন গুরদীপ সিং বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পক্ষেত্র এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে, কারণ উভয় দেশই একসঙ্গে কাজ করার সুফল উপলব্ধি করে।”
তিনি আরও বলেন, “ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক উন্নতির দিকেই এগোবে। কারণ দুই দেশের স্বার্থের মিল রয়েছে এবং ভারতীয় প্রবাসী সম্প্রদায়ের প্রভাবও ক্রমশ বাড়ছে।”
গুরদীপ সিং-এর মতে, উদীয়মান প্রযুক্তি আগামী দিনে সহযোগিতার সবচেয়ে সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। তিনি বলেন, “সেমিকন্ডাক্টর, কোয়ান্টাম প্রযুক্তি কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—সব ক্ষেত্রেই দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে।”
প্রাক্তন ওহাইও অঙ্গরাজ্যের সিনেটর নিরাজ আনতানি আরও আশাবাদী সুরে বলেন, “এই বৈঠক ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ।” তিনি ভারত-আমেরিকা বাণিজ্য চুক্তি এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির পক্ষে ট্রাম্পের অবস্থানের কথাও উল্লেখ করেন।
গত দুই দশকে ভারত ও আমেরিকার মধ্যে প্রতিরক্ষা, বাণিজ্য, প্রযুক্তি, জ্বালানি এবং শিক্ষা ক্ষেত্রে সহযোগিতা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। নয়াদিল্লি এবং ওয়াশিংটনের বিভিন্ন প্রশাসন এই অংশীদারিত্বকে একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক হিসেবে বর্ণনা করে এসেছে।
_______



















