নয়াদিল্লি, ১৫ সেপ্টেম্বর (আইএএনএস): বৃহত্তর স্বার্থ, বেশি আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা এবং আরও বেশি সংখ্যক অংশীদার নিয়ে ভারত এখন আরও জটিল আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে কাজ করছে। তাই পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশকে নিয়মিত নিজেদের কৌশল প্রয়োগ ও পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে বলে মঙ্গলবার মন্তব্য করলেন বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর।
নয়াদিল্লিতে ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব ওয়ার্ল্ড অ্যাফেয়ার্সের (আইসিডব্লিউএ) ২৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত উদ্বোধনী অধিবেশনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে জয়শঙ্কর বলেন, উপসাগরীয় অঞ্চল এবং ইউক্রেন—এই দুই জায়গায় বর্তমানে বড় সংঘাত চলছে। উভয় ক্ষেত্রেই সংঘাতে জড়িত সব পক্ষের সঙ্গে ভারতের সুসম্পর্ক রয়েছে। ফলে পরিস্থিতি মোকাবিলায় ভারতের জন্য একটি ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল তৈরি করা সহজ নয়।
তিনি বলেন, বিভিন্ন স্বার্থের মধ্যে কীভাবে ভারসাম্য বজায় রাখা যায়, তা নিয়ে আলোচনা করা জরুরি। একইভাবে বিশ্ব অর্থনীতিতে বিভিন্ন ক্ষেত্রকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে। শুল্কের ক্ষেত্রে অস্থিরতা এবং বিভিন্ন বাজারে পণ্য ডাম্পিংও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এসব পরিস্থিতি কীভাবে মোকাবিলা করা যায়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়।
বিদেশমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতাও এখন চরম রূপ নিচ্ছে। সংযম কমে যাওয়ায় ঝুঁকি বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে কীভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলা, সংঘাত এড়ানো এবং ঝুঁকি কমানো যায়, তা নিয়ে ভাবনাচিন্তার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে।
জয়শঙ্কর বলেন, বৃহত্তর স্বার্থ, বেশি আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা, আরও বেশি অংশীদার এবং ক্রমশ জটিল হয়ে ওঠা আন্তর্জাতিক পরিবেশের মধ্যে ভারতকে এই পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির সঙ্গে ক্রমাগত নিজেদের মানিয়ে নিতে হবে। অনেক ক্ষেত্রেই সাদা-কালো অবস্থান নেওয়ার পরিবর্তে কৌশল ও প্রতিক্রিয়াকে সর্বোত্তমভাবে সাজানোই সমাধানের পথ হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, ভারতকে অন্য দেশগুলির অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে হলেও নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী তা প্রয়োগ করতে হবে। কূটনীতি মূলত সূক্ষ্ম ভারসাম্য ও পরিস্থিতি বোঝার বিষয়। ভারত অন্যদের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে পারে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেশের নিজস্ব ইতিহাস, অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতা রয়েছে। তাই নিজেদের মধ্যে এই বিষয়গুলি নিয়ে আলোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এই ক্ষেত্রে আইসিডব্লিউএ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
আইসিডব্লিউএ প্রতিষ্ঠার পর থেকেই আন্তর্জাতিক বিষয়গুলি নিয়ে গবেষণা ও আলোচনার প্রসার ঘটিয়ে আসছে বলে উল্লেখ করেন জয়শঙ্কর। ভারতীয় সংসদ আইসিডব্লিউএ-কে ‘জাতীয় গুরুত্বের প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে বিশ্বের সঙ্গে ভারতের বৌদ্ধিক সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির স্বতন্ত্র অবদানকে স্বীকৃতি দিয়েছে বলেও তিনি জানান।
আইসিডব্লিউএ-র ২৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী শুধু প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘ যাত্রাপথ স্মরণ করার উপলক্ষ নয়, আগামী দিনে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি কী ভূমিকা পালন করতে পারে, তা নিয়েও ভাবার সুযোগ বলে মন্তব্য করেন বিদেশমন্ত্রী।
ভারতের ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততার প্রসঙ্গে জয়শঙ্কর বলেন, বর্তমানে বিশ্বের আরও বিস্তৃত পরিসরের দেশ ও অঞ্চলের সঙ্গে ভারত যোগাযোগ রাখছে। ভারতের স্বার্থ ক্রমশ বৈশ্বিক হয়ে উঠেছে, দায়িত্ব বেড়েছে এবং সেই সঙ্গে ভারতের প্রতি প্রত্যাশাও বৃদ্ধি পেয়েছে। গ্লোবাল সাউথ-সহ বিভিন্ন বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ নিয়ে ভারত এখন আরও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিজের অবস্থান তুলে ধরছে। ভারতের বৈশ্বিক ভূমিকা যত বাড়বে, আন্তর্জাতিক বিষয় নিয়ে দেশের বৌদ্ধিক সম্পৃক্ততাকেও ততটাই এগিয়ে যেতে হবে।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রচলিত আলোচনার বড় অংশ অন্য দেশগুলির অভিজ্ঞতা ও ধারণার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। কিন্তু উত্থানশীল ভারতকে বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক নির্ধারণের ক্ষেত্রে নিজের ইতিহাস, অভিজ্ঞতা, স্বার্থ, ধারণা এবং প্রয়োজনে নিজস্ব পরিভাষাকেও আরও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। এই প্রক্রিয়ায় আইসিডব্লিউএ-র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
জয়শঙ্করের মতে, ভারতীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তথ্যভিত্তিক ও যুক্তিনির্ভর বিতর্ককে উৎসাহিত করার মাধ্যমে আইসিডব্লিউএ আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারতের সামনে থাকা বিভিন্ন বিকল্পকে আরও গভীরভাবে বোঝার সুযোগ করে দেয় এবং বিশ্বের প্রতি ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি আরও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তুলে ধরতে সাহায্য করে। কোনও দেশের উত্থানের সঙ্গে যে বিতর্কগুলি স্বাভাবিকভাবেই তৈরি হয়, আইসিডব্লিউএ-কে সেই আলোচনায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।
–আইএএনএস



















