ভদোদরা, ৮ সেপ্টেম্বর (আইএএনএস): গুজরাটে ডেডিকেটেড ফ্রেইট করিডরের সুফল ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মঙ্গলবার রাজনৈতিক বিরোধীদের কটাক্ষ করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। দ্রুতগতির পণ্যবাহী ট্রেন চালু হলে ট্রাক পরিবহণ ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন—এমন কাল্পনিক আপত্তির প্রসঙ্গ তুলে তিনি ‘নারাজ ফুফা জি’ (অসন্তুষ্ট কাকা) মন্তব্য করেন।
মুম্বইয়ের জেএনপিটি বন্দর থেকে ভদোদরা পর্যন্ত ডাবল-স্ট্যাক কনটেনারবাহী পণ্য ট্রেন চলাচলের প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি এই ধরনের ট্রেন ২৫০টিরও বেশি ট্রাকের সমপরিমাণ পণ্য পরিবহণ করতে পারে।
মোদি বলেন, “নারাজ ফুফা জি বলবেন—ট্রাকচালকদের কী হবে? ট্রাকগুলি কোথায় যাবে? যারা ট্রাক কিনেছেন, তাঁদের কী হবে?” এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি রেলপথে পণ্য পরিবহণ বৃদ্ধির সমালোচকদের কটাক্ষ করেন।
তবে রেলপথে পণ্য পরিবহণ বাড়লেও সড়কপথের পরিবহণ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যাবে না বলে স্পষ্ট করেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, বিপুল পরিমাণ পণ্য দ্রুত দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে রেল আরও সক্ষমতা বাড়াবে, অন্যদিকে ট্রাকও পরিবহণের অন্যান্য ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
প্রধানমন্ত্রী ডেডিকেটেড ফ্রেইট করিডরকে দেশের বিদ্যমান পরিবহণ ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে নয়, বরং সামগ্রিক লজিস্টিক সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে তুলে ধরেন।
ভদোদরায় ওয়েস্টার্ন ডেডিকেটেড ফ্রেইট করিডরের গুরুত্বপূর্ণ শেষ পর্যায়ের অংশগুলি জাতির উদ্দেশে উৎসর্গ করার সময় তাঁর এই বক্তব্য সামনে আসে। এর ফলে দেশের ডেডিকেটেড ফ্রেইট করিডর নেটওয়ার্কের কাজ সম্পূর্ণ হয়েছে। মোট ৩২৬ রুট কিলোমিটার দীর্ঘ এই তিনটি অংশ নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ২০,৭০০ কোটি টাকারও বেশি। এই করিডরের মূল লক্ষ্য হল পণ্যবাহী ও যাত্রীবাহী ট্রেনের চলাচল আলাদা করা, পণ্য পরিবহণের ক্ষমতা বাড়ানো এবং যাতায়াতের সময় কমানো।
বক্তৃতায় বিরোধীদের বিরুদ্ধে আরও একটি রাজনৈতিক মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। সরকারের উন্নয়নের পরিসংখ্যান নিয়ে বিভ্রান্তিকর প্রচারের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, “প্রতিটি মোড়ে এমন মানুষ রয়েছেন, যাঁরা ‘মিথ্যার গুঞ্জন’ দিয়ে আপনাদের বিভ্রান্ত করতে পারেন। কিন্তু ভারতের যুবসমাজ ‘সত্যের হুঙ্কার’-এর সঙ্গে এগিয়ে চলেছে।”
ভারতে পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি ও উদীয়মান প্রযুক্তির প্রসঙ্গেই এই মন্তব্য করেন মোদি। তিনি বলেন, ভবিষ্যতের সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন, ডেটা সেন্টার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো শিল্পের জন্য বিপুল পরিমাণ নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ প্রয়োজন হবে। সেই কারণে ভারত সৌর, বায়ু, জলবিদ্যুৎ এবং পারমাণবিক শক্তির ওপর জোর দিচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী জানান, ভারতে ২০০ গিগাওয়াটেরও বেশি সৌর মডিউল উৎপাদন ক্ষমতা তৈরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সূর্য ঘর মুফত বিজলি যোজনার উল্লেখ করে তিনি বলেন, সারা দেশে ৫৫ লক্ষ পরিবার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করেছে। এর মধ্যে গুজরাটের ১১ লক্ষ পরিবার রয়েছে।
পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির সম্প্রসারণ কর্মসংস্থানেরও নতুন সুযোগ তৈরি করেছে বলে দাবি করেন মোদি। উৎপাদন, সৌর প্যানেল স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণের পাশাপাশি নতুন নতুন সরবরাহকারী ও ব্যবসায়ীরাও এই ক্ষেত্রে যুক্ত হচ্ছেন বলে জানান তিনি।
ভবিষ্যতের চাহিদা মেটাতে ভারত আন্তর্জাতিক চুক্তির মাধ্যমে ইউরেনিয়াম, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ এবং রেয়ার-আর্থ খনিজের সরবরাহ নিশ্চিত করার কাজ করছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করার প্রস্তুতির অংশ হিসেবেই এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
এরপর দক্ষতা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পরিবর্তনশীল অর্থনীতিতে শুধুমাত্র প্রথাগত ডিগ্রি অর্জন যথেষ্ট নয়, তরুণদের নতুন দক্ষতাও অর্জন করতে হবে।
প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া পড়ুয়াদের জন্য বিনামূল্যে অনলাইন কোচিংয়ের ব্যবস্থা করার দিকে সরকার এগোচ্ছে বলেও জানান তিনি। দেশের সেরা শিক্ষকদের মাধ্যমে এই প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে তরুণদের প্রস্তুত করতে একটি বড় সরকারি কর্মসূচি চালু করা হবে বলেও জানান মোদি। তাঁর বক্তব্য, এআই-ভিত্তিক দক্ষতা শুধু তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকবে না; কৃষি, স্বাস্থ্য পরিষেবা, উৎপাদন শিল্প এবং রোবোটিক্সেও এর ব্যাপক ব্যবহার সম্ভব।
ভারতের যুবসমাজকে এআই-তে দক্ষ হয়ে ওঠার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তরুণরা এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃষি সমাধান, স্বাস্থ্য পরিষেবা সংক্রান্ত অ্যাপ্লিকেশন, উৎপাদন ব্যবস্থার উন্নতি এবং রোবোটিক্স-ভিত্তিক স্টার্ট-আপ গড়ে তুলতে পারে।
ভদোদরার এদিনের কর্মসূচিতে রেল, সড়ক, আবাসন, জল সরবরাহ, নগরোন্নয়ন এবং পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ৩৫,০০০ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত ছিল। তিনটি ওয়েস্টার্ন ডেডিকেটেড ফ্রেইট করিডর অংশ জাতির উদ্দেশে উৎসর্গ করা হয়, পাশাপাশি নতুন রেল পরিষেবা চালু এবং আরও রেল ও সড়ক প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়।
–আইএএনএস


















