ঢাকা, ৪ জুলাই (আইএএনএস): বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ‘ধর্ম অবমাননা’র অভিযোগকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে সংখ্যালঘু অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন হিউম্যান রাইটস কংগ্রেস ফর বাংলাদেশ মাইনরিটিজ (এইচআরসিবিএম)। সংগঠনটির দাবি, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত এ ধরনের ১৭টি ঘটনার নথিভুক্ত করেছে তারা।
এইচআরসিবিএম এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর উপজেলার হিন্দু যুবক দীপ্ত রায়ের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক ধর্ম অবমাননার অভিযোগ আবারও সংখ্যালঘুদের লক্ষ্য করে উদ্বেগজনক প্রবণতাকে সামনে এনেছে।
সংগঠনের বক্তব্য, “সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি অভিযোগ সামনে আসে, জনতা জড়ো হয়, পুলিশ দ্রুত অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়। কিন্তু ডিজিটাল ফরেনসিক পরীক্ষা শেষ হওয়ার আগেই বাড়িঘর, দোকান, মন্দির এবং গোটা পরিবার আতঙ্কের মধ্যে পড়ে যায়।”
ভুক্তভোগীর পরিবার ও প্রত্যক্ষদর্শীদের উদ্ধৃতি দিয়ে সংগঠনটির দাবি, দীপ্ত রায়ের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ “মিথ্যা এবং অজুহাতের ভিত্তিতে করা হয়েছে”।
এইচআরসিবিএম জানিয়েছে, তাদের পর্যালোচনা করা এফআইআরের নথি অনুযায়ী মামলাটি একটি কথিত সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট, পুলিশি হেফাজত, একটি মোবাইল ফোন বাজেয়াপ্ত করা এবং বাংলাদেশের দণ্ডবিধি ও সাইবার-সংক্রান্ত আইনের বিভিন্ন ধারার আওতায় দায়ের হয়েছে।
তবে সংগঠনের দাবি, গ্রেফতারের সময় এমন কোনও ফরেনসিক প্রমাণ নথিতে ছিল না, যা থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে ওই পোস্টটি দীপ্ত রায় নিজে লিখেছিলেন, প্রকাশ করেছিলেন, নিয়ন্ত্রণ করতেন বা তা প্রকাশের উদ্দেশ্য তাঁর ছিল।
পরিবার ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যের ভিত্তিতে সংগঠনটির অভিযোগ, এই ঘটনার জেরে জনরোষ সৃষ্টি হয় এবং অভিযুক্তের বাড়ি, জীবিকা ও একটি স্থানীয় উপাসনাস্থলও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এইচআরসিবিএমের দাবি, “বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের কাছে এটি আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং সামাজিক ধ্বংসের একটি পুনরাবৃত্ত পদ্ধতিতে পরিণত হয়েছে।”
সংগঠনটির অভিযোগ, গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে শত শত সংখ্যালঘু যুবক ও পরিবার ভুয়ো, বিকৃত, হ্যাক করা, ভুয়ো পরিচয়ে তৈরি বা যাচাইবিহীন ডিজিটাল তথ্যের ভিত্তিতে ধর্ম অবমাননার অভিযোগের শিকার হয়েছে।
এর আগে সংগঠনটি দাবি করেছিল, গত বছর বাংলাদেশে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে ৭৩ জন সংখ্যালঘু যুবককে গ্রেফতার করা হয়েছিল।
এইচআরসিবিএমের মতে, তাহিরপুরের ঘটনাটি বাংলাদেশের একটি গভীর মানবাধিকার সংকটের দিক নির্দেশ করে। তাদের বক্তব্য, প্রকৃত সমস্যা কেবল আপত্তিকর কোনও পোস্ট করা হয়েছে কি না, তা নয়; বরং অভিযোগ ওঠার ঘটনাই অনেক ক্ষেত্রে শাস্তির সমান হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
সংগঠনটি বলেছে, আদালত সত্যতা যাচাই করার আগেই বা ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা অ্যাকাউন্ট হ্যাক, ভুয়ো পরিচয়, কারসাজি বা মিথ্যা আরোপের বিষয়টি পরীক্ষা করার আগেই অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হচ্ছে, পরিবারের সদস্যদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে, সম্পত্তির উপর হামলা হচ্ছে এবং পুরো সংখ্যালঘু সম্প্রদায় আতঙ্কের মধ্যে পড়ছে।
এই পরিস্থিতিকে “জাতীয় সংখ্যালঘু সুরক্ষা সংক্রান্ত জরুরি অবস্থা” হিসেবে বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়ে এইচআরসিবিএম বাংলাদেশ সরকার, পুলিশ, বিচারব্যবস্থা, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার সংস্থা, বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক মিশন, আন্তর্জাতিক ডিজিটাল অধিকার সংগঠন এবং সোশ্যাল মিডিয়া সংস্থাগুলির হস্তক্ষেপ দাবি করেছে।
সংগঠনটির মতে, “তাহিরপুরের ঘটনাকে স্থানীয় ঘটনা হিসেবে ভুলে গেলে চলবে না। এটি একটি সতর্কবার্তা। বাংলাদেশে এখন একটি মাত্র অভিযোগই কোনও সংখ্যালঘু যুবকের জীবন ধ্বংস করতে পারে, একটি পরিবারকে বিপদের মুখে ফেলতে পারে, একটি মন্দিরের ক্ষতি করতে পারে এবং গোটা সম্প্রদায়কে অবরুদ্ধ অবস্থায় ঠেলে দিতে পারে। এই চক্র না ভাঙা পর্যন্ত ধর্ম অবমাননার অভিযোগ কেবল আইনি বিষয় নয়, বরং ভয়, বাস্তুচ্যুতি, অর্থনৈতিক ধ্বংস এবং সামষ্টিক শাস্তির হাতিয়ার হিসেবেই থেকে যাবে।”
























