আগরতলা, ৩ জুলাই: রাজ্যের সরকারি নিয়োগ ব্যবস্থায় গতি আনতে এবং দীর্ঘসূত্রিতা দূর করার দাবিতে মুখ্যমন্ত্রী ডা. মানিক সাহার কাছে একটি বিস্তারিত স্মারকলিপি পেশ করেছেন বিধায়ক সুদীপ রায় বর্মণ। পাঠানো ওই স্মারকলিপিতে তিনি বর্তমান নিয়োগ ব্যবস্থাকে “শম্ভুক গতির” বলে উল্লেখ করে দাবি করেন, নির্দিষ্ট বার্ষিক নিয়োগ ক্যালেন্ডারের অভাব এবং দীর্ঘসূত্রিতার কারণে রাজ্যের হাজার হাজার শিক্ষিত বেকার যুবক-যুবতী আর্থিক, সামাজিক ও মানসিকভাবে চরম ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
স্মারকলিপিতে সুদীপ রায় বলেন, দেশের বিভিন্ন কেন্দ্রীয় নিয়োগ সংস্থা যেমন ইউপিএসসি, এসএসসি, আইবিপিএস এবং অধিকাংশ রাজ্যের লোকসেবা কমিশন নির্দিষ্ট বার্ষিক সময়সূচি অনুসরণ করে ৬ থেকে ১০ মাসের মধ্যে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করলেও ত্রিপুরায় টিপিএসসি, জেআরবিটি ও অন্যান্য নিয়োগকারী সংস্থার মাধ্যমে একটি নিয়োগ সম্পূর্ণ হতে গড়ে দুই থেকে তিন বছর কিংবা তারও বেশি সময় লেগে যাচ্ছে। তাঁর অভিযোগ, মন্ত্রিসভার অনুমোদিত বহু নিয়োগের সিদ্ধান্ত বছরের পর বছর বাস্তবায়নের অপেক্ষায় পড়ে রয়েছে।
স্মারকলিপিতে তিনি একাধিক নিয়োগ প্রক্রিয়ার উদাহরণ তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ত্রিপুরা সিভিল সার্ভিস ও ত্রিপুরা পুলিশ সার্ভিসে সর্বশেষ নিয়মিত নিয়োগ হয়েছিল ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ৪০টি পদের জন্য, যার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল ২০২২ সালের মার্চ মাসে। এরপর নতুন করে আর কোনো ধারাবাহিক নিয়োগ শুরু হয়নি।
তিনি উল্লেখ করেন, ২০২৪ সালের আগস্টে মন্ত্রিসভা ২১৬টি সাব-ইন্সপেক্টর পদে নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিলেও এখন পর্যন্ত টিপিএসসিতে সেই নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয়নি। একইভাবে ১৬৪টি তহশিলদার পদ, শতাধিক আমিন পদ, ১০৪টি অডিটর পদ এবং বনদপ্তরের ১০৪টি ফরেস্টার ও ১৯৪টি ফরেস্ট গার্ড পদেও দীর্ঘ বিলম্ব হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। যদিও ফরেস্টার ও ফরেস্ট গার্ড নিয়োগে সম্প্রতি আবেদন গ্রহণ শুরু হয়েছে, তবুও পুরো নিয়োগ সম্পন্ন হতে আরও দীর্ঘ সময় লাগবে বলে তাঁর আশঙ্কা।
সুদীপ রায়ের দাবি, রাজ্য সরকার নতুন করে ত্রিপুরা ফাইন্যান্স সার্ভিস নামে একটি ক্যাডার গঠন করলেও প্রায় নয় মাস অতিক্রম হওয়ার পরও ১০৪টি গ্রুপ-এ পদের নিয়োগ কার্যকর হয়নি। পাশাপাশি বিভিন্ন দপ্তরের ইন্সপেক্টর, সাব-ইন্সপেক্টর, সিডিপিও, ফুড, লেবার, ট্যাক্স, রেভিনিউ, পঞ্চায়েত, স্মল সেভিংসসহ বহু ফিডার পদে নিয়োগ এখনও শুরু হয়নি। আরও কয়েকশো পদের প্রস্তাব দীর্ঘদিন ধরে মন্ত্রিসভার অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।
জেআরবিটির ক্ষেত্রেও তিনি একই ধরনের অভিযোগ তুলে বলেন, এলডিসি, মাল্টি টাস্কিং স্টাফ, স্টোর কিপার, পাম্প অপারেটর, পিয়ন, ড্রাইভারসহ প্রায় ১,৫০০ থেকে ২,০০০টি গ্রুপ-সি ও ডি পদের জন্য মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত হলেও এখনও নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয়নি। অন্যদিকে জেআরবিটি-১-এর নিয়োগ প্রক্রিয়া আদালতের নির্দেশে প্রায় পাঁচ বছর পরও সম্পূর্ণ হয়নি।
উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রেও বিলম্বের অভিযোগ তুলে তিনি জানান, সরকারি কলেজগুলোর জন্য ২০১ জন সহকারী অধ্যাপক নিয়োগের প্রক্রিয়া প্রায় দেড় বছর আগে শুরু হলেও এখনও আবেদন গ্রহণের পর্যায়েই সীমাবদ্ধ রয়েছে। একই সঙ্গে ২০২৫ সালে আরও ২০০ জন সহকারী অধ্যাপক নিয়োগের সিদ্ধান্ত হলেও তা বাস্তবায়নের কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।
শিক্ষা দপ্তরের নিয়োগ প্রসঙ্গে স্মারকলিপিতে বলা হয়েছে, টেট-১ ও টেট-২-এর ২,০৫৬টি শিক্ষক পদে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার দুই বছর পরও চূড়ান্ত ফল প্রকাশ হয়নি। একইভাবে এসটিজিটি নিয়োগের চূড়ান্ত ফল প্রকাশে বিলম্ব এবং এসটিপিজিটি নিয়োগে চারজন নির্বাচিত প্রার্থী এখনও পোস্টিং না পাওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি রাজ্যে বিপুল সংখ্যক শিক্ষক শূন্যপদের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া ত্রিপুরা পুলিশে ৯১৬ জন কনস্টেবল ও ১,২০০ জন টিএসআর জওয়ান নিয়োগ, জেল পুলিশ ও দমকল বিভাগের বিভিন্ন নিয়োগ, গ্রামোন্নয়ন দপ্তরের ২০০ জন ইঞ্জিনিয়ার, আবগারি বিভাগের সাব-ইন্সপেক্টর এবং অন্যান্য ফিডার পদে নিয়োগ প্রক্রিয়াতেও দীর্ঘসূত্রিতার অভিযোগ করেন তিনি।
স্মারকলিপিতে সুদীপ রায় দাবি করেন, ত্রিপুরায় পর্যাপ্ত শিল্প ও বেসরকারি কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকায় অধিকাংশ শিক্ষিত যুবক-যুবতীর একমাত্র ভরসা সরকারি চাকরি। অথচ ধীরগতির নিয়োগ ব্যবস্থার কারণে বহু প্রার্থী বয়সসীমা অতিক্রম করে সুযোগ হারাচ্ছেন এবং মানসিক ও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
এই পরিস্থিতিতে তিনি নিয়োগ ব্যবস্থায় কয়েকটি মৌলিক সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছেন। তাঁর প্রধান প্রস্তাব হলো, রাজ্যে একটি অভিন্ন “একক বার্ষিক নিয়োগ পরীক্ষা” চালু করা, যার মাধ্যমে প্রতি বছর টিপিএসসি গ্রুপ-এ, গ্রুপ-বি ও বিভিন্ন ফিডার পদে একযোগে নিয়োগ করবে। পাশাপাশি জেআরবিটির মাধ্যমে প্রতি বছর নিয়মিত গ্রুপ-সি ও ডি নিয়োগ, ফিক্সড-পে পদে সাক্ষাৎকার ব্যবস্থা বাতিল, টিপিএসসি, টিআরবিটি ও জেআরবিটিতে অপেক্ষমান তালিকা প্রকাশ এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর দ্রুত ফল প্রকাশের ব্যবস্থারও দাবি জানিয়েছেন তিনি।
সুদীপ রায়ের মতে, এই সংস্কার কার্যকর হলে একাধিক পৃথক নিয়োগ পরীক্ষার প্রয়োজন কমবে, নিয়োগ প্রক্রিয়ার সময় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে, একই পরীক্ষার মাধ্যমে একাধিক পদ পূরণ করা সম্ভব হবে, পরীক্ষার্থীদের আর্থিক ও মানসিক চাপ কমবে এবং বিভিন্ন নিয়োগে মেধাতালিকার ওভারল্যাপও কমে আসবে।
স্মারকলিপির শেষাংশে তিনি উল্লেখ করেন, অতীতেও তিনি বিধানসভা, সাংবাদিক সম্মেলন এবং মুখ্য সচিবের কাছে একাধিকবার একই বিষয় তুলে ধরেছেন। তিনি মুখ্যমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানিয়েছেন, রাজ্যের শিক্ষিত বেকারদের স্বার্থে বর্তমান নিয়োগ নীতির সংস্কার করে দ্রুত, স্বচ্ছ ও সময়বদ্ধ নিয়োগ ব্যবস্থা চালু করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক।প্রয়োজনে এটিকে সংবাদপত্রের প্রথম পাতার উপযোগী আরও সংক্ষিপ্ত বা টিভি/ওয়েব পোর্টালের স্টাইলে রূপান্তর করে দিতে পারি।
জেআরবিটি ও অন্যান্য পরিচালিত ফিক্সড-পে গ্রুপ-সি/ডি পদগুলোতে সাক্ষাৎকার/ব্যক্তিত্ব পরীক্ষা বাতিল করা (কেন্দ্রীয় ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান/ব্যাংক পরীক্ষাগুলোতে আধিকারিক পদ ছাড়া বাকি সব পদে সাক্ষাৎকার/ব্যক্তিত্ব পরীক্ষা নেই।)
সুদীপ রায় বর্মণের মতে, এই সংস্কার কার্যকর হলে একই পরীক্ষার মাধ্যমে একাধিক পদে নিয়োগ সম্ভব হবে, নিয়োগ প্রক্রিয়ার সময় কমবে, পরীক্ষার্থীদের আর্থিক ও মানসিক চাপ হ্রাস পাবে এবং মেধাতালিকার ওভারল্যাপও কমে আসবে।
স্মারকলিপির শেষে তিনি মুখ্যমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানান, রাজ্যের শিক্ষিত বেকারদের স্বার্থে বর্তমান নিয়োগ নীতিতে প্রয়োজনীয় সংস্কার এনে দ্রুত, স্বচ্ছ ও সময়বদ্ধ নিয়োগ ব্যবস্থা চালু করতে সরকার যেন অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
























