আগরতলা, ৩ জুলাই: সুপ্রিম কোর্টের আর্নেশ কুমার বনাম বিহার রাজ্য মামলায় নির্ধারিত গ্রেফতারের নির্দেশিকা লঙ্ঘন করার অভিযোগে পূর্ব আগরতলা থানার সাব-ইন্সপেক্টর সৈকত দে-কে আদালত অবমাননার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করেছে ত্রিপুরা হাইকোর্ট। বৃহস্পতিবার প্রধান বিচারপতি এম. এস. রামচন্দ্র রাও এবং বিচারপতি বিশ্বজিৎ পালিতের ডিভিশন বেঞ্চ অভিযুক্ত পুলিশ আধিকারিককে ২,০০০ টাকা জরিমানা করার নির্দেশ দেয়। চার সপ্তাহের মধ্যে জরিমানা না দিলে তাঁকে এক মাসের সাধারণ কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে বলেও আদালত জানিয়েছে।
মামলার সূত্রপাত হয় রত্না রায় নামে এক মহিলার দায়ের করা ফৌজদারি রিট পিটিশন থেকে। তিনি অভিযোগ করেন, তাঁর ছেলে সৈকত সাহাকে চলতি বছরের এপ্রিল মাসে কোনও আইনসঙ্গত কারণ ছাড়াই গ্রেফতার করা হয় এবং থানার ভিতরে মারধর করা হয়। তাঁর দাবি, বাড়ি নির্মাণকে কেন্দ্র করে একটি ব্যক্তিগত বিরোধের জেরেই এই ঘটনা ঘটে।
মামলার শুনানির সময় আদালতের নজরে আসে যে, গ্রেফতারের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের ২০১৪ সালের আর্নেশ কুমার রায়ে নির্ধারিত বাধ্যতামূলক নির্দেশিকা মানা হয়নি। এরপর গত ১৩ মে হাইকোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে আদালত অবমাননার মামলা রুজু করে।
আদালত তার পর্যবেক্ষণে জানায়, সাত বছর বা তার কম সাজাযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে পুলিশ ইচ্ছেমতো গ্রেফতার করতে পারে না। গ্রেফতারের প্রয়োজনীয়তা যাচাই করা এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সিআরপিসির (বর্তমানে বিএনএসএর সমতুল্য বিধান) ৪১এ ধারার নোটিশ প্রদান বাধ্যতামূলক।
আবেদনকারীর অভিযোগ অনুযায়ী, তাঁদের জি+৩ ভবন নির্মাণ নিয়ে এক প্রতিবেশীর অভিযোগের পর আগরতলা পুরনিগমে হাজিরা দিলেও তাঁদের বিরুদ্ধে কোনও বিরূপ সিদ্ধান্ত হয়নি। এরপর পুরনিগমের কর্মী রবীন্দ্রনাথ ঘোষ এবং স্পেশাল পুলিশ অফিসার জয় দেবনাথ নির্মাণকাজ চালিয়ে যেতে ২ লক্ষ টাকা ঘুষ দাবি করেন বলে অভিযোগ। টাকা দিতে অস্বীকার করায় ৪ এপ্রিল রাতে সৈকত সাহাকে মারধর করে পূর্ব আগরতলা থানায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানেও তাঁর উপর হামলা চালানো হয় বলে রিটে উল্লেখ করা হয়।
আদালতের নির্দেশে থানার সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণ করা হয়। পরে পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে চিকিৎসা নথির ভিত্তিতে সৈকত সাহার শরীরে হামলার চিহ্ন থাকার প্রাথমিক প্রমাণও উঠে আসে। এছাড়া আদালত জানায়, রিট দায়েরের পরেই ৭ মে রবীন্দ্রনাথ ঘোষ ও জয় দেবনাথের বিরুদ্ধে এফআইআর নথিভুক্ত হয়।
পরবর্তীতে হাইকোর্ট এক ডিএসপি-র নেতৃত্বে এবং এক আইজি পদমর্যাদার আধিকারিকের তত্ত্বাবধানে বিশেষ তদন্তকারী দল গঠন করে। এসআইটির রিপোর্টে বলা হয়, থানার সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, সৈকত সাহাকে থানার ভিতরে রবীন্দ্রনাথ ঘোষ ও জয় দেবনাথ মারধর করছেন। তদন্তে ২ লক্ষ টাকা ঘুষ দাবি এবং টাকা না দেওয়ায় হামলার অভিযোগেরও সমর্থনে তথ্য পাওয়া গেছে।
অভিযুক্ত সাব-ইন্সপেক্টর আদালতে দাবি করেন, সৈকত সাহা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় জনশৃঙ্খলা ভঙ্গ করছিলেন, তাই ত্রিপুরা পুলিশ আইন এবং ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা-এর বিধান অনুযায়ী তাঁকে প্রতিরোধমূলকভাবে গ্রেফতার করা হয়েছিল।
তবে হাইকোর্ট পুলিশি নথি, জেনারেল ডায়েরি, চিকিৎসা রিপোর্ট এবং এসআইটির তদন্তে একাধিক অসঙ্গতি খুঁজে পায়। আদালত জানায়, এসআইটির রিপোর্টে জনশৃঙ্খলা ভঙ্গের কোনও প্রমাণ মেলেনি। পাশাপাশি, অভিযুক্ত অফিসারের পেশ করা মেডিক্যাল রিপোর্টেও গুরুতর অসামঞ্জস্য রয়েছে।
সবদিক বিবেচনা করে আদালত রায় দেয়, অভিযুক্ত পুলিশ অফিসার সুপ্রিম কোর্টের আর্নেশ কুমার রায়ে নির্ধারিত বাধ্যতামূলক নির্দেশিকা লঙ্ঘন করেছেন এবং থানার ভিতরে অভিযোগকারী যুবকের উপর হামলা ঠেকাতেও ব্যর্থ হয়েছেন। সেই কারণেই তাঁকে আদালত অবমাননার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে জরিমানা এবং অনাদায়ে কারাদণ্ডের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
…….























