মুম্বই, ১০ জুন (আইএএনএস): প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর তুলনা টেনে রাজনৈতিক প্রচারের বিরোধিতা করে কেন্দ্রের এনডিএ সরকারকে তীব্র আক্রমণ করলেন এনসিপি (শরদচন্দ্র পাওয়ার) প্রধান শরদ পাওয়ার। বুধবার দলের ২৭তম প্রতিষ্ঠা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি ইতিহাস বিকৃতি, কৃষকদের দুর্দশা, মহারাষ্ট্রের পরিস্থিতি এবং ভারতের বিদেশনীতি নিয়ে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে সরব হন।
২০২৩ সালের জুলাই মাসে এনসিপি ভাঙনের পর নিজের নেতৃত্বাধীন এনসিপি (এসপি)-র প্রধান হিসেবে ভাষণ দিতে গিয়ে শরদ পাওয়ার বলেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নরেন্দ্র মোদির দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ, তবে শুধুমাত্র ক্ষমতায় থাকার সময়সীমার ভিত্তিতে তাঁর সঙ্গে জওহরলাল নেহরুর তুলনা করা যায় না।
পাওয়ার স্মরণ করিয়ে দেন, স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে নেহরু দীর্ঘ সময় কারাবাস করেছিলেন। তাঁর কথায়, “প্রধানমন্ত্রীর পদ একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। সেই পদের মর্যাদা রক্ষা করা প্রত্যেক ভারতীয়র দায়িত্ব। আমরা নীতিগত প্রশ্নে সরকারের বিরোধিতা করব, কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর পদকে অসম্মান করব না।”
তবে তিনি স্পষ্ট করেন, ইতিহাস ও অবদানের বিচারে নেহরু এবং মোদিকে এক কাতারে ফেলা যায় না।
দলের ভাঙনের প্রসঙ্গেও কটাক্ষ করেন শরদ পাওয়ার। এনসিপির অজিত পাওয়ার শিবিরের তরফে প্রতিষ্ঠা দিবস উপলক্ষে দেওয়া বড়সড় বিজ্ঞাপনের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, তাঁর রাজনৈতিক জীবনে কখনও এত ব্যয়বহুল প্রচারের পথে হাঁটেননি। তবে দলের কর্মীদের বিপুল উপস্থিতিকে তিনি স্বাগত জানান।
ভাষণে মহারাষ্ট্রের মন্ত্রী গিরিশ মহাজন-এর সাম্প্রতিক মন্তব্যেরও তীব্র সমালোচনা করেন শরদ পাওয়ার। পঞ্জাবে শিখ সম্প্রদায়ের এক অনুষ্ঠানে ‘অপারেশন ব্লু স্টার’ নিয়ে দেওয়া বক্তব্যকে তিনি “হাস্যকর” ও “অত্যন্ত অনভিপ্রেত” বলে অভিহিত করেন।
পাওয়ার বলেন, রাজনৈতিক স্বার্থে ইতিহাস বিকৃত করা জাতীয় ঐক্যের পক্ষে ক্ষতিকর। তাঁর অভিযোগ, “মহারাষ্ট্রের এক মন্ত্রী পঞ্জাবে গিয়ে এমন প্রচার করছেন যে শিখদের হত্যাকাণ্ডের পিছনে কংগ্রেসপন্থী মানুষজন দায়ী ছিলেন। এ ধরনের মন্তব্য অত্যন্ত দায়িত্বজ্ঞানহীন।”
তিনি আরও বলেন, অতীতে কিছু দুঃখজনক ঘটনা ঘটেছিল এবং কিছু শক্তি যুবসমাজকে ভুল পথে পরিচালিত করেছিল, যার ফলে বহু হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। কিন্তু সেই ঘটনাগুলিকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার না করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
নেহরু-গান্ধী পরিবারের অবদান প্রসঙ্গে শরদ পাওয়ার বলেন, এই পরিবারের আত্মত্যাগকে মুছে ফেলা সম্ভব নয়। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এবং রাজীব গান্ধী উভয়েই অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসবাদের শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছিলেন।
বাংলাদেশের জন্মের প্রসঙ্গ তুলে তিনি দাবি করেন, ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারতের মর্যাদা বৃদ্ধি করেছিলেন এবং পাকিস্তানকে উপযুক্ত জবাব দিয়েছিলেন, যার ফলেই বাংলাদেশের সৃষ্টি সম্ভব হয়েছিল।
এরপর মহারাষ্ট্রের কৃষি সঙ্কটের বিষয়টি তুলে ধরে রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন শরদ পাওয়ার। তাঁর অভিযোগ, সার সংকটের কারণে কৃষকদের রাতভর দোকানের সামনে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। কৃষকদের দুর্দশার প্রতি সরকার উদাসীন বলে তিনি দাবি করেন।
সম্প্রতি অল্প কয়েক দিনের মধ্যে কৃষক আত্মহত্যার ঘটনা বেড়ে যাওয়ার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ক্ষমতাসীনরা কৃষকদের শ্রমের মূল্য দিচ্ছেন না।
এই পরিস্থিতিতে মহারাষ্ট্র সরকারকে ৮ থেকে ১০ দিনের আলটিমেটাম দেন শরদ পাওয়ার। তিনি জানান, প্রান্তিক ও বঞ্চিত মানুষের সমস্যা নিয়ে এনসিপি নেতৃত্ব শীঘ্রই বৈঠক করবে।
তাঁর হুঁশিয়ারি, “প্রয়োজনে এনসিপি রাস্তায় নামবে। আমাদের দাবি না মানলে সর্বাত্মক আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।”
বিদেশনীতি নিয়েও কেন্দ্রকে আক্রমণ করেন প্রবীণ এই নেতা। বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির উল্লেখ করে তিনি বলেন, ঐতিহাসিকভাবে অন্যায়ের শিকার দেশগুলির পাশে দাঁড়ানোই ভারতের স্বাধীন বিদেশনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল।
পাওয়ারের অভিযোগ, বর্তমানে সেই স্বাধীন ও ভারসাম্যপূর্ণ বিদেশনীতি দুর্বল হয়ে পড়েছে। তাঁর মতে, ইরানের উপর আক্রমণের মতো পরিস্থিতিতে ভারতের ঐতিহ্যগত কূটনৈতিক অবস্থান আগের মতো দৃঢ়ভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে না।
ভাষণের শেষে দলীয় কর্মীদের উদ্দেশে শরদ পাওয়ার বলেন, “এনসিপি চুপ করে বসে থাকবে না। কঠোর পরিশ্রম এবং মানুষের মধ্যে থেকে কাজ করেই আমাদের নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করতে হবে।”
তিনি কর্মীদের সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানিয়ে আসন্ন রাজনৈতিক লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত থাকার বার্তাও দেন।
— আইএএনএস
























