নয়াদিল্লি, ১০ জুন (আইএএনএস): পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীর (পিওকে)-এ চলমান বিক্ষোভ দমনে পাকিস্তানি প্রশাসনের কঠোর অবস্থান শেষ পর্যন্ত গোটা পাকিস্তানজুড়ে অস্থিরতার জন্ম দিতে পারে বলে মনে করছে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলি। তাদের দাবি, পিওকে-তে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ করে ইসলামাবাদ এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করছে, যা ভবিষ্যতে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
গোয়েন্দা সূত্রের মতে, পাকিস্তান সরকার নিরাপত্তা বাহিনীকে বিক্ষোভ দমনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী সংগঠন জয়েন্ট আওয়ামি অ্যাকশন কমিটি (জেএএসি)-র দাবি, ইতিমধ্যে ৪৫০ জনেরও বেশি ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে এবং ২০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
এক সরকারি সূত্রের দাবি, বর্তমানে পিওকে-র সাধারণ মানুষ চরম দুর্দশার মধ্যে রয়েছেন। বহু এলাকায় খাদ্য ও পানীয় জলের সংকট দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি নীলম ভ্যালি, মিরপুর, পুঞ্চ, রাওয়ালকোট এবং মুজাফ্ফরাবাদ-সহ একাধিক অঞ্চলে মোবাইল পরিষেবাও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
ভারতীয় গোয়েন্দা মহলের এক আধিকারিকের মতে, বলপ্রয়োগের মাধ্যমে আপাতত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা গেলেও আন্দোলনের প্রভাব দ্রুত পাকিস্তানের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক স্তরেও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাকিস্তানি দূতাবাস ও মিশনের সামনে বিক্ষোভের খবর পাওয়া যাচ্ছে।
এক গোয়েন্দা আধিকারিকের দাবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আন্দোলনকারীদের সমর্থনে প্রচার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তাঁর মতে, আন্দোলন দমনের লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয় স্তরে সমন্বিত প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে বলে বিভিন্ন সূত্রে ইঙ্গিত মিলছে।
সূত্রের দাবি, পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র দফতর জেএএসি-র চার গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে গ্রেপ্তারের তথ্য দিলে ১০ লক্ষ পাকিস্তানি রুপি পুরস্কার ঘোষণা করেছে। একইসঙ্গে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সংকটের প্রসঙ্গ তুলে ওই আধিকারিক বলেন, বাজেট প্রক্রিয়া নানা জটিলতার মুখে পড়লেও সরকার এই ধরনের পুরস্কার ঘোষণায় পিছপা হচ্ছে না।
আরও এক আধিকারিকের মতে, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে একদিকে বলপ্রয়োগ করা হচ্ছে, অন্যদিকে তাঁদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলা দায়েরের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। আন্দোলনকারীদের বক্তৃতা, ইলেকট্রনিক যোগাযোগ এবং লেখালেখি খতিয়ে দেখে দ্রুত তদন্ত শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে পুলিশকে।
গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, আন্দোলনের অন্যতম মুখ শওকত নওয়াজ মীর এবং খাজা মেহরান আরশাদকে বিশেষভাবে নিশানা করা হয়েছে। মুজাফ্ফরাবাদের সিনিয়র সুপারিনটেনডেন্ট অফ পুলিশকে মীরের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ ও রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগ তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পাকিস্তান বিষয়ক পর্যবেক্ষকদের মতে, পিওকে-তে দীর্ঘদিন ধরেই অসন্তোষ জমছিল। কয়েক মাস আগে সরকার ও জেএএসি-র মধ্যে আলোচনা হলেও প্রতিশ্রুতি পূরণ না হওয়ায় ফের আন্দোলন শুরু হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের দাবি, কেবল বলপ্রয়োগ বা মামলা দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার এবং বিদেশে পাকিস্তানি মিশনের সামনে বিক্ষোভ প্রশাসনের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে পিওকে-সহ গোটা পাকিস্তানের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবনতিও জনঅসন্তোষ বাড়িয়ে তুলছে।
গোয়েন্দা মূল্যায়নে বলা হয়েছে, এই আন্দোলন শুধু পিওকে-তে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং শীঘ্রই পাকিস্তানের অন্যান্য অংশেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। রাজনৈতিক মহলের একাংশও নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে। তাঁদের আশঙ্কা, পিওকে-র মানুষের সমর্থনে ইসলামাবাদ ও করাচির মতো শহরেও বড় আন্দোলন গড়ে উঠতে পারে।
সূত্রের দাবি, এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির-এর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। গত ৬ জুন সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় জেএএসি-কে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তকে অনেকেই ভুল পদক্ষেপ বলে মনে করছেন। উন্নয়ন ও নাগরিক অধিকারের দাবিতে আন্দোলনরত একটি সংগঠনকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করার সিদ্ধান্ত উল্টো ফল দিতে পারে বলেও মত সংশ্লিষ্ট মহলের।
আরও একটি সূত্রের মতে, শুরুতে আন্দোলনকারীদের দাবি ছিল উন্নয়নমূলক সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি। কিন্তু বর্তমানে জেএএসি পিওকে-র জন্য অধিক স্বায়ত্তশাসন এবং ইসলামাবাদের সরাসরি নিয়ন্ত্রণের অবসান দাবি করছে। এই দাবিগুলি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও জোরালোভাবে উত্থাপিত হচ্ছে। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র প্রচারের পাশাপাশি পাকিস্তান প্রশাসন এমন এক সঙ্কটের মুখোমুখি, যা গোটা দেশে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
______



















