অ্যাশভিল, ১ সেপ্টেম্বর (আইএএনএস): বিশ্ব অর্থনীতির পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে ভারত নিজেকে মানিয়ে নিতে সক্ষম এবং এর ফলে দেশের প্রবৃদ্ধির গতি ব্যাহত হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় অর্থ ও কর্পোরেট বিষয়ক মন্ত্রী নির্মলা সীতারামন। একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেছেন, অপরিশোধিত তেল, পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য ও বিভিন্ন ধরনের সার আমদানির ক্ষেত্রে ভারতের এখনও যথেষ্ট নির্ভরতা রয়েছে।
অ্যাশভিলে জি২০ অর্থমন্ত্রীদের বৈঠকের ফাঁকে আইএএনএস-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে নির্মলা সীতারামন ভারতীয় অর্থনীতিকে একটি প্রাণবন্ত ও পরিবর্তনশীল অর্থনীতি হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “আমাদের সামনে চ্যালেঞ্জ রয়েছে—এ নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই।”
অর্থমন্ত্রী জানান, ভারত বিশ্বের অন্যতম বড় অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য আমদানিকারক দেশ। পাশাপাশি ইউরিয়া, অ্যামোনিয়া ও ডিএপি-সহ বিভিন্ন ধরনের সার এবং সারের কাঁচামালও ভারতকে আমদানি করতে হয়। দেশে কিছু উৎপাদন ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও এই ক্ষেত্রগুলিতে আমদানির প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি জানান।
তবে নির্মলা সীতারামনের মতে, বৈশ্বিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে ভারতীয় অর্থনীতি যেভাবে দ্রুত মানিয়ে নিচ্ছে, তাতে দেশের প্রবৃদ্ধির গতি ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে। তিনি বলেন, “এগুলি সবই একটি প্রাণবন্ত অর্থনীতির স্পষ্ট ইঙ্গিত—এমন একটি অর্থনীতি, যা বিশ্বব্যাপী পরিবর্তনের প্রতি সাড়া দেয় এবং এমনভাবে নিজেকে মানিয়ে নেয় যাতে আমাদের প্রবৃদ্ধি প্রভাবিত না হয়।”
রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়াও নিয়মিত দেশের অর্থনীতির মূল্যায়ন প্রকাশ করে এবং বিভিন্ন সূচক ইতিবাচক দিকেই এগোচ্ছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, “চ্যালেঞ্জ অবশ্যই রয়েছে। প্রতিবার কোনও চ্যালেঞ্জ সামনে এলে সরকার ভারতকে সুবিধাজনক অবস্থানে রাখার জন্য কাজ করবে।”
২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের প্রথম ত্রৈমাসিকে ভারতের অর্থনীতি ৭.৮ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বৈশ্বিক চাপের মধ্যেও এই প্রবৃদ্ধিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন নির্মলা সীতারামন। তাঁর কথায়, “এই সমস্ত বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের প্রথম ত্রৈমাসিকে ভারতীয় অর্থনীতি ৭.৮ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে—এটি অত্যন্ত আনন্দের বিষয়। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হচ্ছে যে সাধারণ মানুষের কঠোর পরিশ্রম সুফল দিচ্ছে।”
তিনি জানান, এই প্রবৃদ্ধি কোনও একটি নির্দিষ্ট খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রেই সম্প্রসারণ ঘটেছে। উৎপাদন ক্ষেত্রে ৯.২ শতাংশ এবং আর্থিক ও পেশাদারি পরিষেবা ক্ষেত্রে ১২.১ শতাংশ বৃদ্ধি হয়েছে বলে জানান তিনি।
নির্মলা সীতারামনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার বর্তমানে প্রায় ৭০০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। তাঁর কথায়, “এগুলি সাধারণ কোনও সংখ্যা নয়।”
ভারতীয় নাগরিকদের ভূমিকা, অর্থনৈতিক সংস্কার এবং ডিজিটাল পরিকাঠামোর সম্প্রসারণ দেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করেছে বলেও উল্লেখ করেন অর্থমন্ত্রী। তাঁর মতে, ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার প্রসার ছোট, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসাগুলিকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ করে দিয়েছে।
তিনি বলেন, ইউপিআই, এনপিসিআই, কিউআর কোড-সহ ডিজিটাল ব্যবস্থার ব্যাপক প্রসারের ফলে ছোট ও মাঝারি ব্যবসাগুলিও বিশ্ববাজারে পৌঁছতে পারছে। এর মাধ্যমে ভারতীয় অর্থনীতির দৃঢ়তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
ব্যবসা পরিচালনা সহজ করতে রাজ্য সরকারগুলির নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপেরও প্রশংসা করেন অর্থমন্ত্রী। তিনি জানান, ইতিমধ্যে ১,০০০-এরও বেশি আইন বাতিল করা হয়েছে এবং প্রায় ৪০,০০০ বিধি-নিয়ম সরলীকরণ করা হয়েছে।
সরকার শিল্পমহল, ব্যবসায়ী ও বাণিজ্যিক সংস্থাগুলির সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রেখে চলেছে বলেও জানান তিনি। পাশাপাশি দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি এবং বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা সংক্রান্ত চুক্তির ক্ষেত্রেও কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। বিদেশে ভারতীয়দের আমানত ও বিনিয়োগও দেশের ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা এবং সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকগুলির প্রতি আস্থার প্রতিফলন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জি২০ অর্থমন্ত্রীদের বৈঠকে যোগ দিতে বর্তমানে অ্যাশভিলে রয়েছেন নির্মলা সীতারামন। তিনি জানান, জি২০-র মার্কিন সভাপতিত্বের অধীনে প্রবৃদ্ধি, বৈশ্বিক ভারসাম্যহীনতা এবং আর্থিক সাক্ষরতার মতো বিষয়গুলিতে ভারতের সমর্থন রয়েছে। এসব বিষয়ে “ন্যায্য ও উন্মুক্ত আলোচনা” চায় ভারত বলেও জানান তিনি।
জি২০ বৈঠকের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, পোল্যান্ড, কাতার, দক্ষিণ কোরিয়া এবং রাশিয়ার প্রতিনিধিদের সঙ্গেও দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেছেন অর্থমন্ত্রী। জি২০ বৈঠক শেষে তিনি নিউইয়র্কে যাবেন। সেখানে ভারতে বিনিয়োগে আগ্রহী বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে তাঁর বৈঠক করার কথা রয়েছে।
—আইএএনএস


















