নয়াদিল্লি, ১০ জুলাই (আইএএনএস): ইংরেজি শব্দ ‘এনকাউন্টার’-এর আক্ষরিক অর্থ সাক্ষাৎ, মুখোমুখি হওয়া বা সংঘর্ষ। কিন্তু ভারতে এই শব্দটি সময়ের সঙ্গে একটি ভিন্ন অর্থ ধারণ করেছে। বর্তমানে ‘এনকাউন্টার’ বলতে সাধারণত পুলিশের গুলিতে অভিযুক্ত বা সন্দেহভাজন ব্যক্তির মৃত্যুকেই বোঝানো হয়। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই শব্দের ব্যবহার, আইনের শাসন এবং জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
সম্প্রতি দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরে ১২ বছরের এক কিশোরীকে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত চারজনের মধ্যে একজন পুলিশের ‘এনকাউন্টার’-এ নিহত হন। এই ঘটনার তদন্তভার ইতিমধ্যেই সিআইডির হাতে তুলে দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতে ‘এনকাউন্টার’ শব্দের এই বিশেষ ব্যবহার গত শতাব্দীর ষাটের দশকের শেষভাগ এবং সত্তরের দশকে পশ্চিমবঙ্গে নকশাল আন্দোলনের সময় থেকে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সে সময় পুলিশের সঙ্গে নকশালপন্থীদের সংঘর্ষে মৃত্যুর ঘটনাগুলি সংবাদমাধ্যমে নিয়মিতভাবে ‘এনকাউন্টার’-এ নিহত বলে উল্লেখ করা হতো।
ক্রমে শব্দটি এমন একটি অর্থ ধারণ করে, যেখানে বোঝানো হয় পুলিশ ও অপরাধী বা জঙ্গিদের মধ্যে গুলির লড়াইয়ে আত্মরক্ষার জন্য পুলিশ গুলি চালিয়েছে এবং অভিযুক্ত নিহত হয়েছে।
পরবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন রাজ্যেও একাধিক আলোচিত ‘এনকাউন্টার’-এর ঘটনা সামনে আসে। কোথাও এই ধরনের অভিযান রাজনৈতিকভাবে জনপ্রিয়তা পেয়েছে, আবার কোথাও তদন্তে ভুয়ো এনকাউন্টার বা বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগও উঠে এসেছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলির দীর্ঘদিনের অভিযোগ, ‘এনকাউন্টার’ শব্দের স্বাভাবিকীকরণ বিচারপ্রক্রিয়াকে দুর্বল করতে পারে। তাদের মতে, তদন্ত ও আদালতের বিচারের পরিবর্তে যদি তাৎক্ষণিকভাবে প্রাণঘাতী ব্যবস্থা গ্রহণকে গ্রহণযোগ্য হিসেবে তুলে ধরা হয়, তবে আইনের শাসন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
মুম্বই পুলিশের প্রাক্তন কর্মকর্তা দয়া নায়ক ‘এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট’ হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছিলেন। নব্বইয়ের দশকের শেষভাগ ও ২০০০-এর দশকের শুরুতে মুম্বইয়ের আন্ডারওয়ার্ল্ডের বিরুদ্ধে তাঁর একাধিক অভিযানের কথা বিভিন্ন বই, সংবাদ প্রতিবেদন এবং চলচ্চিত্রে উঠে এসেছে। যদিও পরবর্তীকালে তিনি দুর্নীতির অভিযোগে দীর্ঘদিন বরখাস্ত ছিলেন। পরে অভিযোগ থেকে মুক্তি পেয়ে পুনর্বহাল হন এবং অবসর গ্রহণ করেন।
অভিধানগুলিতেও শব্দটির ব্যবহারে পার্থক্য দেখা যায়। কেমব্রিজ অভিধানে ‘এনকাউন্টার’-এর অর্থ অপ্রত্যাশিতভাবে কারও সঙ্গে দেখা হওয়া বা কোনও অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হওয়া। মেরিয়াম-ওয়েবস্টার অভিধানে শত্রুপক্ষের মধ্যে হঠাৎ সংঘর্ষের কথাও উল্লেখ রয়েছে।
অন্যদিকে, অক্সফোর্ড লার্নার্স ডিকশনারি ‘ইন্ডিয়ান ইংলিশ’ হিসেবে আলাদা করে উল্লেখ করেছে যে, ‘এনকাউন্টার’ বলতে এমন একটি ঘটনাকে বোঝায়, যেখানে পুলিশ সন্দেহভাজন অপরাধীকে গুলি করে হত্যা করে।
উইকিপিডিয়াতেও উল্লেখ করা হয়েছে, ভারত ও পাকিস্তানে ‘এনকাউন্টার কিলিং’ শব্দটি নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে বিচারবহির্ভূত হত্যার প্রসঙ্গে বহুল ব্যবহৃত হয়। যদিও সরকারি বর্ণনায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ঘটনাকে পুলিশ ও অভিযুক্তদের মধ্যে গুলির লড়াই হিসেবে তুলে ধরা হয়।
ভাষাবিদদের মতে, ‘এনকাউন্টার’ শব্দটির এই অর্থগত পরিবর্তন শুধুমাত্র ভাষার বিবর্তন নয়, বরং দেশের সামাজিক, রাজনৈতিক এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিরও প্রতিফলন।
























