নয়াদিল্লি/গুয়াহাটি, ৯ জুন (আইএএনএস): কিংবদন্তি আদিবাসী নেতা ও স্বাধীনতা সংগ্রামী বিরসা মুন্ডা-র শহিদ দিবসে মঙ্গলবার দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তাঁকে শ্রদ্ধা জানানো হয়। দিল্লি বিজেপির সভাপতি, উপরাষ্ট্রপতি এবং অসমের মুখ্যমন্ত্রী তাঁর সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও আদিবাসী সমাজের অধিকার রক্ষায় অবদানের কথা স্মরণ করেন।
দিল্লি বিজেপি সভাপতি তথা কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী হর্ষ মালহোত্রা সরাই কালে খানে আদিবাসী শিশু ও মহিলাদের সঙ্গে বিরসা মুন্ডার প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন। তিনি বলেন, বিরসা মুন্ডা ছিলেন এমন এক মহান নেতা যিনি আদিবাসী সমাজের অধিকার, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষায় জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।
সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে মালহোত্রা বলেন, “‘আবুয়া দিশুম, আবুয়া রাজ’ ছিল ভগবান বিরসা মুন্ডার দেওয়া স্লোগান। তিনি সারা জীবন ‘নিজের দেশ, নিজের শাসন’-এর বার্তা ছড়িয়ে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছেন।”
তিনি আরও বলেন, স্বল্পায়ু জীবন হলেও জল, জমি ও আদিবাসী সংস্কৃতি রক্ষার জন্য তাঁর নিরলস সংগ্রামের কারণে বিরসা মুন্ডা আদিবাসী সমাজে দেবতুল্য মর্যাদা পেয়েছিলেন।
মালহোত্রার মতে, পরিবেশ সংরক্ষণও বিরসা মুন্ডার জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। তিনি বলেন, “আজ বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে জলস্তর কমছে, বনভূমি ধ্বংস হচ্ছে। এই বিষয়ে সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে এবং আদিবাসী সমাজের স্বতন্ত্র পরিচয় বজায় রেখেই তাদের মূল স্রোতে যুক্ত করতে হবে।”
ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে বিরসা মুন্ডার সংগ্রামের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, জমিদারি ব্যবস্থার মাধ্যমে আদিবাসীদের জমি কেড়ে নেওয়ার বিরুদ্ধে তিনি প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন এবং তির-ধনুকের মতো ঐতিহ্যবাহী অস্ত্র নিয়ে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন।
এদিকে উপরাষ্ট্রপতি সি. পি. রাধাকৃষ্ণন এক্স-এ দেওয়া বার্তায় বলেন, “ধরতি আবা ভগবান বিরসা মুন্ডার শহিদ দিবসে তাঁকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি। তাঁর জীবন ছিল সাহস, আত্মসম্মান এবং ন্যায়ের প্রতি অবিচল প্রতিশ্রুতির প্রতীক।”
তিনি বলেন, ঐতিহাসিক ‘উলগুলান’ আন্দোলনের মাধ্যমে বিরসা মুন্ডা অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের চেতনা জাগিয়ে তুলেছিলেন এবং আদিবাসী সমাজকে তাদের অধিকার, পরিচয় ও মর্যাদা রক্ষার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছিলেন।
উপরাষ্ট্রপতি আরও উল্লেখ করেন যে, ঝাড়খণ্ডের রাজ্যপাল হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিন এবং সম্প্রতি উপরাষ্ট্রপতি হওয়ার পরও তিনি বিরসা মুন্ডার জন্মস্থান উলিহাতুতে গিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগ পেয়েছিলেন, যা তাঁর কাছে গভীর শ্রদ্ধার বিষয়।
তিনি বলেন, “ভগবান বিরসা মুন্ডার আত্মত্যাগ ও আদর্শ সামাজিক ন্যায়, ক্ষমতায়ন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের পথে দেশকে আজও পথ দেখাচ্ছে। তাঁর উত্তরাধিকার আগামী প্রজন্মের জন্যও অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।”
অন্যদিকে অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বিরসা মুন্ডাকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, আদিবাসী গৌরব এবং দেশসেবার এক অনন্য প্রতীক বলে উল্লেখ করেছেন।
এক্স-এ দেওয়া বার্তায় তিনি লেখেন, “ভগবান বিরসা মুন্ডা অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, আদিবাসী গৌরব এবং দেশসেবার এক অনন্য উদাহরণ স্থাপন করেছেন। তাঁর জীবন ও আত্মত্যাগ আমাদের সামাজিক ন্যায়, আত্মসম্মান ও জনকল্যাণের পথে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করবে।”
১৮৭৫ সালে বর্তমান ঝাড়খণ্ডে জন্মগ্রহণকারী বিরসা মুন্ডা ব্রিটিশ শাসন এবং আদিবাসীদের উপর চাপিয়ে দেওয়া শোষণমূলক ভূমি নীতির বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক ‘উলগুলান’ বা ‘মহাবিদ্রোহ’-এর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তাঁর আন্দোলন হাজার হাজার আদিবাসীকে নিজেদের অধিকার, পরিচয় এবং ঐতিহ্যগত জমির মালিকানা রক্ষার লড়াইয়ে উদ্বুদ্ধ করেছিল।
অসম-সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে, বিশেষত চা-জনজাতি সম্প্রদায়ের মধ্যে বিরসা মুন্ডা এখনও প্রতিরোধ, মর্যাদা ও ক্ষমতায়নের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হন। তাঁর অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে কেন্দ্র সরকার তাঁর জন্মদিন ১৫ নভেম্বরকে ‘জনজাতীয় গৌরব দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করেছে।
উল্লেখ্য, ১৯০০ সালের ৯ জুন মাত্র ২৫ বছর বয়সে ব্রিটিশদের হেফাজতে রাঁচি জেলে বিরসা মুন্ডার মৃত্যু হয়। কিন্তু তাঁর সংগ্রাম ও আদর্শ আজও দেশের কোটি মানুষের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে রয়েছে।























