আগরতলা, ২১ এপ্রিল: আধ্যাত্মিকতা ও সেবার এক অনন্য সমন্বয়ে পশ্চিম ত্রিপুরা জেলার মোহনপুর মহকুমার অন্তর্গত ফকিরমুড়া গ্রাম এক ঐতিহাসিক দিনের সাক্ষী হয়ে রইল। ২১শে এপ্রিল ২০২৬, মঙ্গলবার, আদি শঙ্করাচার্যের পুণ্য তিথিতে মা ত্রিপুরেশ্বরীর উদ্দেশে নিবেদিত ‘মা সৌন্দর্য চিন্ময়ী মন্দির’-এর শুভ দ্বারোদ্ঘাটন হয়। একইসঙ্গে চিন্ময় মিশনের ৭৫তম বর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে এই পুণ্য প্রাঙ্গণে এক গভীর জাতীয়তাবাদী ও আধ্যাত্মিক আলোচনাসভার আয়োজন করা হয়, যেখানে উপস্থিত ছিলেন দেশের বিশিষ্ট রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ।
অনুষ্ঠানের সূচনায় ত্রিপুরার রাজমাতা বিভু কুমারী দেবী ভারতের চিরন্তন ঐক্যের বার্তা প্রদান করেন। তিনি বলেন, “আমাদের মধ্যে বিবিধতা থাকতে পারে, কিন্তু আমাদের সকলের মাতৃভূমি হলো আমাদের এই ভারতবর্ষ।” তিনি প্রতিটি নাগরিকের হৃদয়ে ভারতমাতার প্রতি আত্মসমর্পণের ভাবনা জাগ্রত করার আহ্বান জানান।
ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী ড. মানিক সাহা তাঁর বক্তব্যে পরম পূজনীয় রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের সরসংঘচালক শ্রী মোহন ভাগবতের উপস্থিতির জন্য গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। মন্দিরের অপূর্ব স্থাপত্যশৈলীর প্রশংসা করে তিনি বলেন, “এই মন্দির শুধু ত্রিপুরা নয়, সমগ্র ভারতবাসীর জন্য আধ্যাত্মিকতা ও শ্রদ্ধার এক আলোকবর্তিকা হিসেবে পথ প্রদর্শন করবে।” মুখ্যমন্ত্রী চিন্ময়া হরিহরা বিদ্যালয়ের সম্পূর্ণ বিনামূল্যে শিক্ষাদানের মহৎ উদ্যোগকে ভূয়সী প্রশংসা করে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে সকল প্রকার সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
মহারাষ্ট্রের মাননীয় রাজ্যপাল ও ত্রিপুরার প্রাক্তন উপমুখ্যমন্ত্রী তথা ত্রিপুরার রাজপরিবারের সন্তান শ্রী জিষ্ণু দেববর্মণ তাঁর সংক্ষিপ্ত অথচ তাৎপর্যপূর্ণ ভাষণে বৈদিক দর্শনের সারকথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “প্রত্যেকটি বিদ্যালয়ই হলো এক একটি মন্দির।” ‘একম সদ্বিপ্রা বহুধা বদন্তী’— এই মন্ত্র উচ্চারণ করে তিনি ব্যাখ্যা করেন, “বহুত্বের মধ্যেও আমরা এক। ধর্ম ছাড়া শিক্ষা অপূর্ণ।”
চিন্ময় মিশনের পক্ষ থেকে স্বামী বিজ্ঞানন্দ আশীর্বচন প্রদান করেন। বক্তব্য রাখেন মিশনের উত্তর পূর্ব ভারতের প্রধান স্বামী মিত্রানন্দ মহারাজ। তাঁর বক্তব্য সকলকে মুগ্ধ করেছে।আদি শঙ্করাচার্যের পুণ্যতিথিতে এই মন্দির উদ্বোধনের জন্য তিনি সকলকে ধন্যবাদ জানিয়ে ভবিষ্যতের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে সুযোগ্য নাগরিক হিসেবে সমাজের কল্যাণে নিজেদের নিবেদিত করবে।
ত্রিপুরার মাননীয় রাজ্যপাল ইন্দসেনা রেড্ডি বর্তমান ভোগবাদী সমাজ ব্যবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে চিন্ময় মিশনের ভূমিকার গভীর প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, “ত্রিপুরার মতো সীমান্তবর্তী রাজ্যে এই বিদ্যালয় ও মন্দির স্থাপন শুধু একটি ধর্মীয় কাজ নয়, এটি এক অনন্য সমাজসংস্কারমূলক প্রয়াস।”
অনুষ্ঠানের মুখ্য আকর্ষণ ছিলেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের পরম পূজনীয় সরসংঘচালক শ্রী মোহন ভাগবত। গড়িয়া পূজার পুণ্য লগ্নে উপস্থিত বিপুল জনসমুদ্রের উদ্দেশে তিনি জ্ঞান ও বোধের গভীর পার্থক্য ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, “জ্ঞান বা পাণ্ডিত্য মানে কেবল ভাষণ নয়, জ্ঞান হলো বোধ। গত দুই হাজার বছর ধরে বিশ্ব বিজ্ঞান থেকে সমাজতন্ত্র— সব কিছুর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছে। কিন্তু আজ বিশ্ব বুঝতে পারছে, সমগ্র পৃথিবীর প্রয়োজন ভারতের জীবনদৃষ্টিভঙ্গি ও সনাতন ধর্মের পথনির্দেশ।” তিনি মন্দিরের সামাজিক ভূমিকার ওপর জোর দিয়ে বলেন, “মন্দির কেবল উপাসনার স্থল নয়, এটি ছিল ভারতীয় সমাজজীবনের কেন্দ্রবিন্দু। বর্তমান যুগে শক্তির পাশাপাশি ভক্তিও প্রয়োজন।” সরসংঘচালক দক্ষিণ ভারতের সেবামূলক কাজের বিশেষ উল্লেখ করে বলেন, যে ব্যক্তি সবার সঙ্গে মিলেমিশে থেকে সেবা করেন, সমাজ তাঁকেই চিরদিন স্মরণ রাখে— এটাই ভারতের প্রকৃত সংস্কৃতি।
শেষপর্যন্ত তিনি দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেন। তিনি বলেন, “ভারতের বিবিধতার মধ্যেই একতার শক্তি নিহিত। কিন্তু ভারতের এই উত্থানকে আটকাতে বহিঃশক্তি আমাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির নিরন্তর প্রয়াস চালাচ্ছে। আমাদের সকলকে এই বিষয়ে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে।”
অনুষ্ঠানে রাজ্যের কৃষিমন্ত্রী শ্রী রতনলাল নাথ ছাড়াও চিন্ময় মিশনের ত্রিপুরা রাজ্য সভাপতি ও সম্পাদকবর্গ সংক্ষিপ্ত আলোচনা করেন। অনুষ্ঠানটি শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠে শিক্ষা, আধ্যাত্মিকতা ও দেশপ্রেমের এক মহামিলন, যা আগামী প্রজন্মের কাছে পাথেয় হয়ে থাকবে।


















