কলকাতা, ৬ জুন (হি. স.) : মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাদ্যায় দাবি করেছেন, দেশের মধ্যে শিক্ষায় ‘সেরার সেরা বাংলা’। ২০২৩ সালের এনআইআরএফ (ন্যাশনাল ইনস্টিটিউশনাল র্যাঙ্কিং ফ্রেমওয়ার্ক)-এর রিপোর্ট সদ্য প্রকাশিত হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ কিন্তু খুব আশাব্যঞ্জক কিছু দেখাতে পারেনি।
সেরা ১০ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় থেকে মুখ রেখেছে যাদবপুর। সেরা ১০ কলেজের তালিকায় এবার নিজেদের অবস্থান রেখেছে সেন্ট জেভিয়ার্স এবং রহড়া রামকৃষ্ণ মিশন। এগুলো নিয়েই উল্লাসে মেতেছেন অনেকে। কিন্তু সার্বিক বিশ্লেষণে হতাশার নিদর্শন অনেক।
২০১৬ সালে দেশের প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ব়্যাঙ্ক দেওয়ার এই প্রক্রিয়া শুরু করেছিল কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রক। সেই সময় ৩,৫০০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এই ব়্যাঙ্কিং প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়েছিল। আট বছর পর, অংশগ্রহণকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়ে ৮,৬৮৬ হয়েছে। শিক্ষাদান, শেখা এবং সংস্থান, গবেষণা এবং পেশাদারি অনুশীলন, স্নাতক স্তরের ফলাফল, এবং অন্তর্ভুক্তি এবং উপলব্ধি – এই বিষয়গুলির ভিত্তিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিকে ব়্যাঙ্ক করা হয়েছে। মোট ১২টি বিভাগে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির র্যাঙ্কিং প্রকাশ করা হয়েছে। এই ১২টি বিভাগ হল – বিশ্ববিদ্যালয়, ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠান, কলেজ, ম্যানেজমেন্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মেডিকেল কলেজ, ফার্মেসি কলেজ, আর্কিটেকচার প্রতিষ্ঠান, ডেন্টাল কলেজ, আইন ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং কৃষি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সার্বিক বিচারে সেরা প্রতিষ্ঠান।
এনআইআরএফ তালিকায় কলেজ বিভাগে প্রথম ১০-এ আছে বাংলার দুটি, প্রথম ১০০-তে বাংলার ৮টি। সেন্ট জেভিয়ার্স উন্নীত হয়েছে অষ্টম থেকে পঞ্চম স্থানে এবং রহড়া রামকৃষ্ণ মিশন ১৩ থেকে ৮ম স্থানে। রাজা নরেন্দ্রলাল খান উইমেন্স কলেজ উন্নীত হয়েছে ৭৩ থেকে ৬৪ স্থানে, মেদিনীপুর কলেজ উন্নীত হয়েছে ৯৭ থেকে ৭৩ স্থানে। প্রথম ১০০-তে এবার ঠাঁই পেলেও অবনমন হয়েছে বেলুড় রামকৃষ্ণ মিশন, বেথুন ও স্কটিশ চার্চের।
একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, দেশের সেরা ১০ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকা থেকে এবার ছিটকে গেল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। গত বছর এই তালিকায় আট নম্বরে ছিল সিইউ। এবার বাংলা থেকে প্রথম দশে রয়েছে একমাত্র যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বীকৃতি ধরে রেখেছে আইআইএসসি বেঙ্গালুরু। সার্বিকভাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে এবারও সেরা হয়েছে আইআইটি মাদ্রাজ। সেরা দশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তালিকায় বাংলা থেকে রয়েছে একমাত্র আইআইটি খড়গপুর।
বিজ্ঞানী, উপাচার্য ডঃ আশুতোষ ঘোষের মতে, “সার্বিকভাবে এই সমীক্ষায় উচ্চশিক্ষায় আশার আলো দেখলাম না। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মান ভীষণ কমেছে। যতটা মনে পড়ছে গবেষণা ক্যাটাগোরিতে এই বিশ্ববিদ্যালয় ২০১৬-‘১৭ অর্থবর্ষেও ছিল ১৬ নম্বর স্থানে। এবার ৩৫-এ। যাদবপুরও এই ক্যাটাগোরিতে এক বছরে নেমেছে ১৩-তম স্থান থেকে ১৯-তম স্থানে। যাদবপুরে পঠনপাঠনের মূল ভিত্তি যেহেতু ইঞ্জিনিয়ারিং, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ওরা বরাবরই কলকাতার চেয়ে এগিয়ে থাকে। তাই বলে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক অবনমন মেনে নেওয়া যাচ্ছে না।”
এনআইআরএফ সমীক্ষায় দেখাচ্ছে যাদবপুর, কলকাতা থেকে বার হওয়া পড়ুয়ারা প্রায় সকলেই ভাল বেতনের কাজ পাচ্ছেন। আশুতোষবাবু বলেন, “তথ্যগুলো সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকে পাঠানো হয়। কিন্তু বাস্তবের সঙ্গে তার কোনও মিল পাইনা। আমার বিপুল সংখ্যক ছাত্রছাত্রী হন্যে হয়ে কাজ খুঁজছে।” প্রায় একই সংশয় প্রাক্তন উপাচার্য, বর্তমানে একটি নামী বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অধিকর্তা ডঃ বাসব চৌধুরীর। তাঁর কথায়, “আমরা কি মিথ্যে তথ্য দিচ্ছি? এটা খতিয়ে দেখা দরকার। আর মানোন্নয়নের ব্যাপারে আমার মতামত হল: লেখাপড়াতে আরও মন দেওয়া প্রয়োজন।”
সদ্য প্রাক্তন উপাচার্য ডঃ ওমপ্রকাশ মিশ্রর মতে, “কেন্দ্রের আর্থিক অনুদান ভীষণভাবে কমে যাওয়ায় যাদবপুর-সহ বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা মার খাচ্ছে। রাষ্ট্রীয় উচ্চতর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (রুশা)-এর টাকা যাদবপুর এখনও পায় নি।”
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তথা সারা বাংলা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি (আবুটা)-র কর্মকর্তা গৌতম মাইতির কথায়, “শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এধরণের ৱ্যাঙ্কিং ও রেটিং-এর উদ্দেশ্য, মাপকাঠি ও পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন আছে। তবে অর্থ, পরিকাঠামো, সরকারি দৃষ্টিভঙ্গী যে শিক্ষা ও গবেষণার উৎকর্ষের পথে মূল বাধা তা নিয়ে কিন্তু কোনো সন্দেহ নেই। সরকার শিক্ষা ও গবেষণা কাজে বিশ্ববিদ্যালয়কে স্বাধিকার দিলে এবং পর্যাপ্ত অর্থ ও পরিকাঠামোর ব্যবস্থা করলে বিশ্ববিদ্যালয়ের গুনমান আরও বাড়বে।”
সমীক্ষায় যাদবপুরের গবেষণায় বেশ কিছুটা নিচে ও সামগ্রিকভাবে একধাপ নিচে নামা প্রসঙ্গে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক পার্থপ্রতীম রায় এই প্রতিবেদককে জানান, “এর কয়েকটি কারণ: ১. গবেষণা প্রকল্পে টাকা কমে যাওয়া। যেখানে প্রায় সমস্ত কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান গবেষণার জন্য অনেকটা টাকা পাচ্ছে, সেখানে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় প্রায় কোনও টাকা পাচ্ছে না। উল্লেখ করা যেতে পারে যে যাদবপুর গবেষণা পত্র প্রকাশ ও তার মানের পরিপ্রেক্ষিতে তার উপরে থাকা অনেকের থেকে বেশি পয়েন্ট পেয়েছে।
২. পেটেণ্ট কম হওয়া, কন্সালটেন্সি থেকে কম টাকা আসাও অবনমনের একটি কারণ।
৩. গবেষণা র ‘পাবলিক পারসেপশন’-এও যাদবপুর অন্যদের থেকে কম নম্বর পেয়েছে।
৪. ‘বিভিন্ন ধরণের পড়ুয়া’ এই ক্যাটাগরিতেও যাদবপুর কম পেয়েছে। এর মানে হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্য রাজ্য বা দেশ এর পড়ুয়া অনুপাতে কম। এর একটি কারণ হচ্ছে ইঞ্জিনিয়ারিং ফ্যাকাল্টিতে কয়েক বছর আগে থেকে ৯০% রাজ্যের পড়ুয়া নেওয়া চালু হয়েছে। ফলে ভিন রাজ্যের পড়ুয়া কমেছে।
৫. বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন কোর্স থেকে আয় খুব কম হওয়ার কারণেও নম্বর কমেছে।
৬. এর সাথে রাজ্য সরকারের কাছ থেকে মেইনটেনেন্স খাতে টাকা অনেকটা কম পাওয়ার কারণে বিভিন্ন গবেষণার যন্ত্রপাতি খারাপ হয়ে গেলে আর সরানো যাচ্ছে না। এটাতেও গবেষণার কাজে ব্যাঘাত ঘটছে।”
২০১৯ থেকে এনআইআরএফ সমীক্ষায় অংশ নিচ্ছে মেদিনীপুর কলেজ। প্রথম দিকে থাকত তালিকায় ১০০ থেকে ১৫০-এর মধ্যে। গত বছর উঠে আসে ৯৭-তম স্থানে। এবার ৭৩-এ। সাফল্যের চাবিকাঠি কী? ২০১৫ থেকে এই কলেজের অধ্যক্ষ ডঃ গোপাল বেরা। তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, এখানকার পড়ুয়ারা পরবর্তীকালে কোথায় ভর্তি হচ্ছেন, তার গত তিন বছরের উপযুক্ত প্রমাণ সমীক্ষকদের কাছে দাখিল করতে হয়। আগে আমরা এটা ঠিক সময়ে সংগ্রহ করতে পারতাম না। গতবার তৎপর হয়ে ৪০ শতাংশ দাখিল করতে পেরেছি। তাতেই ৭৩-এ এসেছি। আগামীবার আরও বেশি এই তথ্যপ্রমাণ দিতে পারব। আসলে পঠনপাঠনের নিয়মানুবর্তিতা ও বিভিন্ন স্তরে নিষ্ঠার সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনার প্রশ্নটাও গুরুত্বপূর্ণ।”
গোপালবাবুর মতে, “পারশেপশনের দিক থেকে আমরা কিছুটা পিছিয়ে থাকি। খুব নামী কলেজের মত নামডাক আমাদের জেলার কলেজের নেই। এদিক থেকে আমরা সর্বোত্তম জায়গায় যেতে পারব না। এ ছাড়াও, আমরা সরকারি অনুদানপুষ্ট কলেজ। গণশিক্ষাটাই মূল লক্ষ্য। দেখুন, যে সব কলেজ এই সমীক্ষায় খুব ভাল ফল করেছে, তারা হয় বেসরকারি বা ট্রাস্ট পরিচালিত। ওদের মত উচ্চ পাশের হার ও কম ড্রপআউটে আমরা যেতে পারব না। কিন্তু কলেজের ঐতিহ্যকে মাথায় রেখে অনেকটা উন্নতি করেছি। আশা করি আরও উন্নত হবে।”



















