আগরতলা, ২৯ আগস্ট: রাজ্যের ক্রীড়া পরিকাঠামোকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার পাশাপাশি প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ, সুযোগ-সুবিধা ও আর্থিক সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে ত্রিপুরাকে ক্রীড়া ক্ষেত্রে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে রাজ্য সরকার বদ্ধপরিকর। খেলাধুলার প্রসারের মধ্য দিয়ে সুস্থ, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও মাদকমুক্ত সমাজ গড়ে তোলার উপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। জাতীয় ক্রীড়া দিবস উপলক্ষে আজ বাধারঘাটস্থিত দশরথ দেব স্টেট স্পোর্টস কমপ্লেক্সে আযোজিত অনুষ্ঠানে একথা বলেন মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডা.) মানিক সাহা।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ত্রিপুরার ক্রীড়া পরিকাঠামো আজ কেবল উত্তর-পূর্বাঞ্চলেই নয়, সারা দেশের মধ্যে দৃষ্টান্ত হয়ে উঠছে। রাজোর খেলোয়াড়দের বিশ্বমানের সুযোগ-সুবিধা প্রদান এবং একটি সুস্থ, মাদকমুক্ত সমাজ গড়ে তুলতে রাজা সরকার বদ্ধপরিকর। তিনি বলেন, বর্তমান রাজ্য সরকার খেলাধুলাকে শুধুমাত্র প্রতিযোগিতার বিষয় হিসেবে দেখছে না, বরং যুবসমাজের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ, শৃঙ্খলা এবং ভবিষ্যৎ গঠনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করছে।
হকির জাদুকর মেজর ধ্যানচাঁদের জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আতীয় ক্রীড়া দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। মেজর ধ্যানচাঁদের জীবন ও ক্রীড়া সাধনার কথা স্মরণ করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও কঠোর পরিশ্রম, অধ্যবসায় ও আত্মনিবেদনের মাধ্যমে তিনি বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে ভারতের গৌরব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁর জীবন ও আদর্শ বর্তমান প্রজন্মের খেলোয়াড়দের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস হযে থাকবে।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, রাজ্যের কৃতি খেলোয়াড় ও ক্রীড়া ব্যক্তিত্বদের যথাযথ সম্মান দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। তাঁদের অবদানকে স্মরণীয় করে রাখতে বিভিন্ন ক্রীড়া পরিকাঠামোর নামকরণও করা হচ্ছে। বাধারঘাটের সিন্থেটিক অ্যাথলেটিক ট্যাক প্রখ্যাত অ্যাথলিট দেবভক্তি জমাতিয়া-র নামে, হকি গ্রাউন্ড প্রখ্যাত কোচ স্বদেশপ্রিয় নন্দী-র নামে, খোয়াইয়ের একটি মাঠ প্রতুল ভট্টাচার্য-র নামে, পানিসাগরের সিথেটিক ট্র্যাক জাতীয় অ্যাথলেটিক্স কোচ ড. অরুণাভ রায়-এর নামে, ধর্মনগরের ইনডোর হল ব্যাডমিন্টন ভারকা গৌরী শেখর রায়-এর নামে এবং আমবাসার স্পোর্টস হোস্টেন জিমন্যাস্ট মধুসুদন সাহা-র নামে নামাঙ্কিত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, খেলোয়াড়দের রাজনীতি দিয়ে নয়, তাঁদের কৃতিত্ব দিয়ে বিচার করা বর্তমান সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি। রাজ্যের ক্রীড়া প্রতিভাকে যথাযথ স্বীকৃতি ও সম্মান দেওয়ার পাশাপাশি তাঁদের আরও এগিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে বলেনও মুখ্যমন্ত্রী জানান।
রাজ্যের ক্রীড়া পরিকাঠামোর উন্নয়নের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ইতিমধ্যে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে একাধিক সিন্থেটিক ফুটবল টার্ফ নির্মাণ করা হয়েছে। উমাকান্ত একাডেমি মাঠে আধুনিক ব্লাডলাইট স্থাপন করা হয়েছে। নরসিংগড়ে আন্তর্জাতিক মানের ক্রিকেট স্টেডিয়াম নির্মাণের কাজ চলছে। বাধারঘাটে প্রায় ৩০ হাজার দর্শক আসন বিশিষ্ট গ্যালারি নির্মাণের পরিকল্পনাও গ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি বাধারঘাট, কৈলাশহর ও উদয়পুরে আধুনিক স্পোর্টস হোস্টেল ও যুব আবাস নির্মাণের কাজ এগিয়ে চলছে।
খেলোয়াড়দের আর্থিক সহায়তার প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে সাফল্য অর্জনকারী খেলোয়াড়দের উৎসাহিত করতে সরকার আর্থিক পুরস্কারের ব্যবস্থা করেছে। সম্প্রতি জুডোতে কমনওয়েলথ গেমস চ্যাম্পিয়ন অস্মিতা দে-কে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে আর্থিক সহায়তা ও জমি প্রদান করে সম্মানিত করার কথাও তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, সীমিত আর্থিক সামর্থ্যের মধ্যেও অস্মিতার সাফল্য রাজ্যের যুবসমাজের অদম্য ইচ্ছাশক্তির প্রতীক।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, খেলাধুলা শুধু শরীরচর্চা নয়, এটি মানুষের মন, চরিত্র ও শৃঙ্খলাবোধ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তিনি আগামী প্রজন্মকে মাদক থেকে দূরে থেকে বই পড়া ও খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানান। “সুপ্ত দেহ, সুস্থ মন”-এই চেতনায় যুবসমাজকে গড়ে তুলতে পারলে মাদকমুক্ত ও শক্তিশালী ত্রিপুরা গড়ে তোলা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
নিজের ক্রীড়া জীবনের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, রাজ্যের প্রতিটি প্রান্তের যুবক-যুবতীকে খেলাধূলার সঙ্গে যুক্ত করার জন্য সরকার ধারাবাহিকভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করছে। রাজ্যের সামগ্রিক উন্নয়নের প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, নীতি আযোগের বিভিন্ন মূল্যায়নে ত্রিপুরা ‘ফ্রন্ট রানার স্টেট’ হিসেবে উঠে এসেছে। অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রের পাশাপাশি পর্যটন ও ক্রীড়া ক্ষেত্রেও রাজ্য দ্রুত এগিয়ে চলেছে। আগামী দিনে আন্তর্জাতিক মানের ক্রীড়া প্রতিযোগিতা আয়োজনের উপযোগী পরিকাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে।
অনুষ্ঠানে যুব বিষয়ক ও ক্রীড়া মন্ত্রী টিস্কু রায় বলেন, বর্তমান সরকারের সময়ে রাজ্যের ক্রীড়া পরিকাঠামোয় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। একসময় যেখানে সিম্বেটিক ফুটবল টার্ফের সংখ্যা ছিল অভ্যন্ত সীমিত, সেখানে বর্তমানে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে একাধিক সিম্বেটিক ফুটবল মাঠ নির্মাণ করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রাকৃতিক ঘাসের মাঠ, ইনডোর হল, ভলিবল কোর্ট, টেনিস কোর্ট ও ব্যাডমিন্টন হল নির্মাণের কাজও চলছে।
ক্রীড়ামন্ত্রী জানান, মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশনায় খেলোয়াড়দের প্রতিভার বিকাশ ও আর্থিক সহায়তার জন্য মুখ্যমন্ত্রী উন্নয়ন প্রকল্প, মুখ্যমন্ত্রী প্রতিভাশালী পুরস্কার এবং মুখ্যমন্ত্রী ট্যালেন্ট সার্চ স্কিম চালু করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে যুব বিষয়ক ও ক্রীড়া মন্ত্রী টিঙ্কু রায় বলেন, বর্তমান সরকারের সময়ে রাজ্যের ক্রীড়া পরিকাঠামোয় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। একসময় যেখানে সিন্থেটিক ফুটবল টার্কের সংখ্যা ছিল অভ্যন্ত সীমিত, সেখানে বর্তমানে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে একাধিক সিন্থেটিক ফুটবল মাঠ নির্মাণ করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রাকৃতিক ঘাসের মাঠ, ইনডোর হল, ভলিবল কোর্ট, টেনিস কোর্ট ও ব্যাডমিন্টন হল নির্মাণের কাজও চলছে।
ক্রীড়ামন্ত্রী জানান, মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশনায় খেলোয়াড়দের প্রতিভার বিকাশ ও আর্থিক সহায়তার জন্য মুখ্যমন্ত্রী উন্নয়ন প্রকল্প, মুখ্যমন্ত্রী প্রতিভাশালী পুরস্কার এবং মুখ্যমন্ত্রী ট্যালেন্ট সার্চ স্কিম চালু করা হয়েছে। জাতীয় স্তরে কৃতি খেলোয়াড়দের আর্থিক সহায়তা প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উন্নত প্রশিক্ষণের জন্য রাজ্যের বাইরে যাওয়া খেলোয়াড়দেরও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হচ্ছে।
জিমন্যাস্টিকসের উন্নয়নের প্রসঙ্গে ক্রীড়া মন্ত্রী জানান, রাজ্যের বিশিষ্ট জিমন্যাস্ট ও প্রশিক্ষকদের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে একটি পৃথক ডেডিকেটেড জিমন্যাস্টিক হল নির্মাণের প্রশাসনিক অনুমোদন ও টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। পাশাপাশি রাজ্যে জাতীয় মানের একটি জিমন্যাস্টিক একাডেমি গড়ে তোলার বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অনুষ্ঠানে মেজর ধ্যানচাঁদের পুত্র, অলিম্পিয়ান ও অর্জুন পুরস্কারপ্রাপ্ত অশোক কুমার সিং মেজর ধ্যানচাঁদের ক্রীড়া জীবন ও দেশপ্রেমের বিভিন্ন দিক স্মরণ করেন। তিনি ত্রিপুরার উদীয়মান খেলোয়াড়দের কঠোর পরিশ্রম, শৃঙ্খলা ও আত্মনিবেদনের মাধ্যমে অলিম্পিক পদক জয়ের লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান। ত্রিপুরার বর্তমান ক্রীড়া পরিকাঠামো ও সরকারের উদ্যোগের প্রশংসা করে তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই রাজ্যের মাটি থেকেই আগামী দিনে আরও অনেক অলিম্পিয়ান উঠে আসবে।
অনুষ্ঠানের শুরুতে মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডা.) মানিক সাহা মেজর ধ্যানচাঁদের একটি মূর্তির আবরণ উন্মোচন করেন। উপস্থিত অতিথিরা মেজর ধ্যানচাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। অনুষ্ঠানে ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে ত্রিপুরার জন্য গৌরব বয়ে আনা কৃতি খেলোয়াড় ও বিশিষ্ট প্রশিক্ষকদের সংবর্ধিত করা হয়। মুখ্যমন্ত্রী, ক্রীড়ামন্ত্রী, অলিম্পিয়ান ও অর্জুন পুরস্কারপ্রাপ্ত অশোক কুমার সিং সহ অন্যান্য অতিথিরা খেলোয়াড় ও প্রশিক্ষকদের হাতে সম্মাননা এবং আর্থিক পুরস্কারের চেক তুলে দেন। আজকের অনুষ্ঠানে এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন বিধায়ক মিনা রানি সরকার, অর্জুন পুরস্কারপ্রাপ্ত জিমন্যাস্ট মন্টু দেবনাথ, যুব বিষয়ক ও ক্রীড়া দপ্তরের সচিব তাপস রায়, ক্রীডা অধিকর্তা এল. ডারলং প্রমুখ।
অনুষ্ঠান শেষে মুখ্যমন্ত্রী সহ উপস্থিত অতিথিগণ মঙ্ক সংলগ্ন সিন্থেটিক হকি মাঠ এবং দেবভক্তি জমাতিয়া সিন্থেটিক অ্যাথলেটিক ট্র্যাক পরিদর্শন করেন। মাঠে খেলোয়াড়দের সঙ্গে মতবিনিময় করেন এবং তাঁদের উৎসাহিত করেন। মুখ্যমন্ত্রী খেলোয়াড়দের সঙ্গে করমর্দন করে তাঁদের শুভেচ্ছা জানান এবং ভবিষ্যতে আরও বড় সাফল্য অর্জনের জন্য উৎসাহ প্রদান করেন।
























