ঢাকা, ২০ জুন (আইএএনএস): বাংলাদেশের কারাগার ব্যবস্থা ক্রমশ এক গভীর বৈষম্যমূলক কাঠামোয় পরিণত হয়েছে, যেখানে ধনী ও প্রভাবশালী বন্দিদের জন্য কারাবাস অনেকাংশে ‘বিলাসবহুল জীবনযাপন’-এ পরিণত হলেও সাধারণ ও দরিদ্র বন্দিদের জন্য তা হয়ে উঠেছে ‘জীবন্ত নরক’— এমনই দাবি করা হয়েছে এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা প্রেসেনজা-র প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের ৭২টি কারাগারে সরকারি ভাবে ‘জেল নয়, সংশোধনাগার’ স্লোগান প্রচার করা হলেও বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।
মানবাধিকারকর্মী ও কারা-বিশেষজ্ঞদের উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সংশোধনাগার হওয়ার কথা এমন একটি নিয়ন্ত্রিত, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও সমতাভিত্তিক ব্যবস্থা, যেখানে আইনভঙ্গকারীদের পুনর্বাসনের সুযোগ দেওয়া হয়। কিন্তু বাংলাদেশের কারাগারগুলিতে প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মের চেয়ে ব্যক্তিগত যোগাযোগ, রাজনৈতিক পরিচয় এবং আর্থিক প্রভাব বেশি কার্যকর বলে অভিযোগ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আসন্ন ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ-২’ নামে দেশব্যাপী অভিযানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সামরিক বাহিনীর যৌথ অংশগ্রহণে প্রতিদিন বহু মানুষকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাঁদের অধিকাংশকেই দেশের বিভিন্ন কারাগারে পাঠানো হচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের ৭২টি কারাগারের মোট ধারণক্ষমতা ৪২,৮৮৭ জন হলেও বর্তমানে সেখানে বন্দির সংখ্যা ৮২ হাজারেরও বেশি, যা নির্ধারিত সক্ষমতার প্রায় দ্বিগুণ। তবে এই অতিরিক্ত ভিড়ের চাপ সব বন্দির উপর সমানভাবে পড়ছে না।
অভিযোগ করা হয়েছে, দরিদ্র ও সাধারণ বন্দিদেরই গাদাগাদি করে অমানবিক পরিবেশে থাকতে হচ্ছে, অন্যদিকে অর্থশালী বন্দিরা সহজেই আলাদা, শান্ত ও তুলনামূলক আরামদায়ক কক্ষে থাকার সুযোগ পাচ্ছেন।
প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, কারাগারের অভ্যন্তরে অর্থই এখন সবচেয়ে বড় প্রভাবক। অনেক বন্দি উন্নত সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার জন্য প্রতি মাসে কয়েক লক্ষ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করছেন।
বিশেষ খাবার, ব্যক্তিগত আবাসন, উন্নত চিকিৎসা সুবিধা এবং বাইরের জগতের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ— সবই অর্থের বিনিময়ে সহজলভ্য বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতায় ভোগা ধনী বন্দিরা ইনসুলিন সংরক্ষণের জন্য ফ্রিজ ব্যবহারের মতো বিশেষ সুবিধাও পাচ্ছেন।
এছাড়া প্রভাবশালী বন্দিদের জন্য হাসপাতাল কারাকক্ষ বা বিশেষ কক্ষগুলি কার্যত আরামদায়ক আবাসে পরিণত হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
অন্যদিকে, সাধারণ বন্দিদের পরিস্থিতিকে ‘মর্মান্তিক ও অমানবিক’ বলে বর্ণনা করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শত শত দরিদ্র বন্দির ঘুমানোর মতো ন্যূনতম জায়গাও নেই এবং তাঁদের অনেককে অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে রাত জেগে কাটাতে হয়।
বাংলাদেশের কারা ব্যবস্থার বর্তমান অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শাস্তি বা সংশোধনের নামে বন্দিদের সঙ্গে এমন শ্রেণিভিত্তিক বৈষম্য ও অবমাননাকর আচরণ কোনও সভ্য সমাজের মানদণ্ড হতে পারে না।
প্রতিবেদনটির মতে, বাংলাদেশের কারাগারগুলিকে সত্যিকারের ‘সংশোধনাগার’-এ রূপান্তর করতে হলে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং বৈষম্যমূলক সুবিধা বন্ধ করে সকল বন্দির জন্য সমান মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করা জরুরি।
_______



















