নয়াদিল্লি, ৪ আগস্ট (আইএএনএস): দেশে ক্রমবর্ধমান ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’ প্রতারণা রুখতে মঙ্গলবার একগুচ্ছ নতুন নির্দেশ জারি করেছে সুপ্রিম কোর্ট। শীর্ষ আদালত রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (আরবিআই)-কে চার সপ্তাহের মধ্যে ‘মিউল অ্যাকাউন্ট’ (অর্থ পাচার বা সাইবার জালিয়াতিতে ব্যবহৃত ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট) সংক্রান্ত একটি স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) তৈরির নির্দেশ দিয়েছে। পাশাপাশি, সব রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলকে সাইবার জালিয়াতির অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং প্রতারিত অর্থ ফেরতের ব্যবস্থা কার্যকর করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচি এবং বিচারপতি ভি. মোহনা-র বেঞ্চ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অধীনস্থ ইন্ডিয়ান সাইবার ক্রাইম কো-অর্ডিনেশন সেন্টার (আই৪সি)-এর চতুর্থ স্ট্যাটাস রিপোর্ট নথিভুক্ত করার পর এই নির্দেশ জারি করে। প্রতিবেদনে বিভিন্ন মন্ত্রক, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, তদন্তকারী সংস্থা, টেলিকম পরিষেবা প্রদানকারী এবং মধ্যস্থতাকারীদের নেওয়া পদক্ষেপের উল্লেখ ছিল।
আদালত কেন্দ্রীয় সরকারের আন্তঃবিভাগীয় কমিটিকে ডিজিটাল অ্যারেস্ট প্রতারণার শিকারদের জন্য যৌথ দায়বদ্ধতা ও ক্ষতিপূরণ কাঠামো তৈরির সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার নির্দেশ দিয়েছে। একইসঙ্গে, চার সপ্তাহের মধ্যে প্রতিটি রাজ্যকে নিজস্ব স্টেট সাইবার ক্রাইম কো-অর্ডিনেশন সেন্টার চালু করা এবং আই৪সি-র সঙ্গে পরামর্শ করে ‘ই-জিরো এফআইআর’ ব্যবস্থা কার্যকর করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ জানিয়েছে, আরবিআইকে চার সপ্তাহের মধ্যে অর্থ পাচার ও সাইবার জালিয়াতির সঙ্গে যুক্ত মিউল অ্যাকাউন্ট মোকাবিলায় একটি এসওপি তৈরি করে তা প্রচার করতে হবে। পাশাপাশি, চূড়ান্ত এসওপি-র একটি কপি দেশের প্রতিটি হাইকোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের কাছেও পাঠাতে হবে।
এছাড়া, প্রতিটি হাইকোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, সাইবার জালিয়াতির মামলায় ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ সংক্রান্ত বিষয়ে বিচারকারী আদালত ও কর্তৃপক্ষকে অভিযোগ নিষ্পত্তির বিদ্যমান ব্যবস্থার বিষয়ে অবহিত করতে। তবে আদালত স্পষ্ট করেছে, এই ব্যবস্থা গ্রহণ করলেও সাংবিধানিক বা আইনি প্রতিকারের পথ খোলা থাকবে।
সাইবার জালিয়াতির কারণে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ হওয়া সংক্রান্ত মামলাগুলির দ্রুত নিষ্পত্তির নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। পাশাপাশি, রাজ্য আইনি পরিষেবা কর্তৃপক্ষগুলিকে ডিজিটাল অ্যারেস্ট প্রতারণা, সাইবার অপরাধ প্রতিরোধ এবং প্রতারিত অর্থ পুনরুদ্ধারের পদ্ধতি সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়ারও পরামর্শ দিয়েছে।
শুনানিতে আদালত জানায়, ন্যাশনাল সাইবার ক্রাইম রিপোর্টিং পোর্টালে ডিজিটাল অ্যারেস্ট সংক্রান্ত অভিযোগের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২৪ সালে যেখানে অভিযোগের সংখ্যা ছিল ১,২৩,৬৭২, তা ২০২৫ সালে কমে দাঁড়ায় ৫৮,২৪৯-এ। ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত অভিযোগের সংখ্যা আরও কমে ১৬,৩৭৭ হয়েছে।
আদালতের পর্যবেক্ষণ, প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া অর্থের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তবে এই ইতিবাচক প্রবণতা বজায় রাখতে ধারাবাহিক নজরদারি অত্যন্ত জরুরি। বেঞ্চ আরও মন্তব্য করে, এ পর্যন্ত গৃহীত পদক্ষেপ প্রশংসনীয় হলেও বিদ্যমান ব্যবস্থাগুলির আরও বিস্তৃত প্রয়োগ, দ্রুত বাস্তবায়ন এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন। মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য হয়েছে আগামী ১৬ সেপ্টেম্বর। এক প্রবীণ দম্পতি ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’ প্রতারণার মাধ্যমে তাঁদের আজীবনের সঞ্চয় হারানোর অভিযোগ জানালে সুপ্রিম কোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এই মামলার শুনানি শুরু করে।
এর আগে ২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্ট ডিজিটাল অ্যারেস্ট সংক্রান্ত তদন্তের দায়িত্ব সিবিআইকে দেয়। একই সঙ্গে টেলিকম পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থা ও বিভিন্ন মধ্যস্থতাকারীকে তদন্তে সহযোগিতার নির্দেশ, সর্বভারতীয় তদন্তে রাজ্যগুলিকে সহায়তার আহ্বান এবং মিউল ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ও সিম কার্ডের অপব্যবহার রোধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
পরে ২০২৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি আদালত কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রককে অভিযোগ নিষ্পত্তি ও প্রতারিত অর্থ ফেরতের জন্য অভিন্ন এসওপি কার্যকর করার নির্দেশ দেয়। একইসঙ্গে সন্দেহভাজন ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে অস্থায়ী ডেবিট হোল্ড সংক্রান্ত এসওপি চূড়ান্ত করতে আরবিআইকে নির্দেশ দেওয়া হয় এবং প্রতারণার শিকারদের জন্য ক্ষতিপূরণ কাঠামো তৈরির আহ্বান জানানো হয়।


















