ঢাকা, ১৮ সেপ্টেম্বর (আইএএনএস): বাংলাদেশে তীব্র গ্যাস সংকটের জেরে ঢাকার বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা গত দুই থেকে তিন মাস ধরে সমস্যায় পড়েছেন। রান্না, জল গরম করা-সহ নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজে গ্যাস না পাওয়ায় অতিরিক্ত অর্থ খরচ করে বিকল্প ব্যবস্থার উপর নির্ভর করতে হচ্ছে তাঁদের। শুক্রবার স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে চলা এই সংকটের কারণে গ্রাহকদের মধ্যে ক্ষোভও বাড়ছে। গ্যাসের সরবরাহ না থাকলেও নিয়মিত মাসিক বিল দিতে হচ্ছে তাঁদের। পাশাপাশি বিদ্যুৎ, এলপিজি, রেস্তোরাঁ থেকে খাবার কেনা-সহ বিভিন্ন বিকল্প ব্যবস্থায় অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, গ্যাসের পরিষেবা না পেয়েও যে অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা তাঁদের বহন করতে হচ্ছে, তার দায় কে নেবে।
ঢাকার ধানমন্ডির বাসিন্দারা জানিয়েছেন, গত দুই মাস ধরে তাঁরা কার্যত গ্যাস পাচ্ছেন না। অথচ রাষ্ট্রায়ত্ত গ্যাস বিতরণ সংস্থা তিতাস গ্যাসকে নিয়মিত মাসিক বিল দিয়ে যেতে হচ্ছে।
লালবাগের গৃহবধূ ফারিয়া আহমেদ বর্ষা জানিয়েছেন, তাঁর পরিবার গত তিন থেকে চার মাস ধরে প্রায় কোনও গ্যাসই পাচ্ছে না। তা সত্ত্বেও প্রতি মাসে তিতাস গ্যাসকে ১,০৮০ টাকা করে বিল দিতে হচ্ছে।
ঢাকার আরও বেশ কয়েকটি এলাকায় একই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। গ্যাসের সরবরাহ না থাকায় রান্না এবং অন্যান্য দৈনন্দিন কাজ চালাতে বাসিন্দাদের বিকল্প জ্বালানির উপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে পরিবারের মাসিক খরচও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাচ্ছে।
‘ঢাকা ট্রিবিউন’-এর প্রতিবেদনে পেট্রোবাংলার পরিসংখ্যান উদ্ধৃত করে জানানো হয়েছে, দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। সেখানে সরবরাহ হচ্ছে প্রায় ২৬৫ থেকে ২৭০ কোটি ঘনফুট। ফলে চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড়সড় ঘাটতি রয়েছে।
গত ২১ জুলাই মহেশখালিতে এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে আগুনের ঘটনায় বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে দৈনিক প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। পরে আংশিকভাবে সরবরাহ স্বাভাবিক হলেও জাতীয় গ্যাস ব্যবস্থায় এর প্রভাব পড়ে।
এই পরিস্থিতিতে বাড়ি, শিল্প এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলিতেও গ্যাসের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। তিতাস গ্যাস জানিয়েছে, এলএনজি সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত তাদের বিতরণ নেটওয়ার্কে অত্যন্ত কম গ্যাসের চাপের পরিস্থিতি বজায় থাকতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের বর্তমান গ্যাস সংকটের দ্রুত কোনও সমাধান নেই। তবে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানো গেলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে।
গ্যাসের ঘাটতির প্রভাব পড়েছে গ্যাসনির্ভর শিল্পগুলিতেও। বিশেষ করে বস্ত্র, নিটওয়্যার, ডাইং এবং ফিনিশিং কারখানাগুলির উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও কোথাও পুরোপুরি উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে, আবার কোনও কোনও কারখানা স্বাভাবিক সক্ষমতার তুলনায় কম উৎপাদন করছে।
বাংলাদেশের কনজিউমার্স অ্যাসোসিয়েশনের (সিএবি) ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসেন ‘ঢাকা ট্রিবিউন’-কে বলেন, যে পরিষেবা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে তা না পাওয়া গেলে গ্রাহকদের কাছ থেকে পুরো বিল নেওয়া উচিত নয়।
তিনি বলেন, সরকার নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সংযোগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু সেই পরিষেবা দেওয়া না হলে পুরো বিল কেন নেওয়া হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
নাজের আরও বলেন, নিয়মিত বেতনভোগী মানুষদের উপর অতিরিক্ত খরচের চাপ সবচেয়ে বেশি পড়ছে, কারণ তাঁদের আয় নিয়মিতভাবে বাড়ে না। তাঁর মতে, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকারের একটি নির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন। তবে এখনও পর্যন্ত এমন কোনও সুস্পষ্ট পরিকল্পনা দেখা যাচ্ছে না।



















