নিজস্ব সংবাদদাতা, নয়াদিল্লি, ১৭ সেপ্টেম্বর: তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরের সংঘাত এবার সরাসরি এসে পড়ল ব্যালটের পরিচয়ে। দলের নাম ও সংরক্ষিত ‘জোড়াফুল’ প্রতীক নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অরূপ রায়-ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় শিবিরের মুখোমুখি দাবির জেরে বৃহস্পতিবার বড় অন্তর্বর্তী সিদ্ধান্ত নিল নির্বাচন কমিশন। আপাতত কোনও গোষ্ঠীকেই এককভাবে ‘অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম বা ‘জোড়াফুল’ প্রতীক ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হল না।
ফলে আসন্ন উপনির্বাচনে দুই শিবিরকেই পৃথক নাম ও পৃথক প্রতীক নিয়ে মাঠে নামতে হবে। চূড়ান্তভাবে দলের নাম ও প্রতীকের অধিকার কোন পক্ষ পাবে, সেই সিদ্ধান্ত অবশ্য এখনও ঝুলে রইল।
বিতর্কের সূত্রপাত দলের সাংগঠনিক কাঠামো ও নেতৃত্ব নিয়ে। ২০ জুন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে জাতীয় কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠক ডেকে নতুন পদাধিকারীদের তালিকা নির্বাচন কমিশনে পাঠানো হয়। সেই সিদ্ধান্তের বৈধতাকেই চ্যালেঞ্জ করে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবির।
বিদ্রোহী গোষ্ঠীর বক্তব্য, দলের সংবিধান অনুযায়ী জাতীয় কার্যনির্বাহী কমিটির মেয়াদ ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৫-এই শেষ হয়ে গিয়েছিল। ফলে পরবর্তী সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত এবং নিয়োগের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এরপর ২২ জুন কলকাতায় বিশেষ অধিবেশন ডেকে অরূপ রায়কে নতুন চেয়ারপার্সন নির্বাচনের দাবি তোলে বিদ্রোহী শিবির। দলের সাংগঠনিক স্বীকৃতি, নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নিয়ে কমিশনের দ্বারস্থ হয় তারা।
বিতর্ক গড়ায় আদালতেও। আলিপুর সিভিল কোর্টে দায়ের হয়। সেখানে দলের সাংগঠনিক ক্ষমতা প্রয়োগ নিয়েও অন্তর্বর্তী আইনি নির্দেশ জারি হয়। বিতর্কের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে উপনির্বাচনের ময়দানে। রেজিনগর ও নন্দীগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্রে দুই শিবিরই তৃণমূলের পরিচয়ে প্রার্থী দেয়।
রেজিনগরে অরূপ রায়ের স্বাক্ষরিত ‘ফর্ম-বি’ নিয়ে সফিউজ্জামান শেখ এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্বাক্ষরিত ‘ফর্ম-বি’ নিয়ে রবিউল আলম চৌধুরী মনোনয়ন জমা দেন। নন্দীগ্রামেও একই ছবি। অরূপ রায় শিবিরের পক্ষে এহতেশামুল হক এবং মমতা শিবিরের পক্ষে সঞ্চিতা প্রধান (দে) মনোনয়ন দাখিল করেন।
একই দলের নামে দুই পক্ষের প্রার্থী—এই পরিস্থিতিতে ব্যালটে দলীয় পরিচয় ও প্রতীক নিয়ে বিভ্রান্তির আশঙ্কা তৈরি হয়। সেই প্রেক্ষিতেই চূড়ান্ত রায়ের আগে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার পথে হাঁটে কমিশন। নির্বাচন প্রতীক (সংরক্ষণ ও বরাদ্দ) আদেশ, ১৯৬৮-এর ১৫ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দুই পক্ষের বক্তব্য শোনে কমিশন। তবে সময়সীমা কম থাকায় এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো সম্ভব নয় বলে জানানো হয়েছে।
ততদিনের জন্য কমিশনের নির্দেশ স্পষ্ট। কোনও পক্ষই এককভাবে ‘অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম ব্যবহার করতে পারবে না। এমনকি, কোনও পক্ষই সংরক্ষিত ‘জোড়াফুল’ প্রতীক ব্যবহার করতে পারবে না। দুই শিবিরকে পৃথক নাম বেছে নিতে হবে। কমিশনের মুক্ত প্রতীকের তালিকা থেকে পৃথক প্রতীক নিতে হবে। ১৮ সেপ্টেম্বর সকাল ১১টার মধ্যে প্রত্যেক পক্ষকে তিনটি করে বিকল্প নাম এবং তিনটি করে প্রতীকের প্রস্তাব জমা দিতে হবে। চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এই অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা বহাল থাকবে।
অর্থাৎ, উপনির্বাচনের আগে তৃণমূলের দীর্ঘ সাংগঠনিক সংঘাত এখন এসে দাঁড়াল একেবারে ব্যালটের সামনে। দলের নাম ও প্রতীকের চূড়ান্ত অধিকার নিয়ে কমিশনের সিদ্ধান্ত এখনও বাকি, কিন্তু আপাতত ‘জোড়াফুল’ ছাড়াই ভোটের ময়দানে নামতে হচ্ছে দুই শিবিরকেই।



















