নয়াদিল্লি, ১১ জুন : নীতি আয়োগের ১১তম গভর্নিং কাউন্সিলের বৈঠকে অংশ নিয়ে ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী অধ্যাপক (ড.) মানিক সাহা মানবসম্পদ উন্নয়নকে কেন্দ্র করে রাজ্যের বিভিন্ন সাফল্য, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং “লক্ষ্য ২০৪৭” ভিশনের রূপরেখা তুলে ধরেন। বৈঠকের মূল প্রতিপাদ্য ছিল “বিকশিত ভারতের জন্য মানবসম্পদ”।
বৈঠকের শুরুতেই মুখ্যমন্ত্রী দেশের দীর্ঘতম সময়ের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ১২ বছর পূর্ণ করায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে অভিনন্দন ও কৃতজ্ঞতা জানান। তিনি বলেন, নীতি আয়োগের গভর্নিং কাউন্সিল ভারতের সমবায়মূলক ফেডারেল কাঠামো, যৌথ চিন্তাভাবনা এবং গঠনমূলক নীতিনির্ধারণের এক গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ।
মুখ্যমন্ত্রী জানান, ত্রিপুরা “বিকশিত ভারত ২০৪৭”-এর জাতীয় লক্ষ্যকে সামনে রেখে “লক্ষ্য ২০৪৭” নামে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, যার উদ্দেশ্য সকল নাগরিকের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক, নিরাপদ, সমৃদ্ধ ও সুস্থ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা।
তিনি বলেন, গত ছয় বছরে রাজ্যের মোট রাজ্য অভ্যন্তরীণ উৎপাদন দ্বিগুণ হয়েছে এবং ত্রিপুরা বর্তমানে দেশের তৃতীয় পূর্ণ সাক্ষর রাজ্য হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন করেছে। পাশাপাশি গত আট বছরে রাজ্য ৩৫০টিরও বেশি জাতীয় ও আঞ্চলিক পুরস্কার লাভ করেছে।
মানবসম্পদ উন্নয়নে সরকারের “হোল অব গভর্নমেন্ট” দৃষ্টিভঙ্গির কথা তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী জানান, শিক্ষাক্ষেত্রে একাধিক রূপান্তরমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয়েছে। মিশন মুকুল-এর মাধ্যমে শিশুদের বিদ্যালয়ে ভর্তির আগে স্কুল পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত করা হচ্ছে। রাজ্যের প্রতিটি ফাউন্ডেশন লিটারেসি ও নিউমেরেসি শ্রেণিকক্ষে নিপুণ কর্নার স্থাপন করা হয়েছে।
এছাড়া এনসিইআরটি-র বিদ্যা প্রবেশ কাঠামোর ভিত্তিতে তৈরি বিদ্যা-সেতু মডিউল নবভর্তি প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয় শিক্ষায় সহজ অভিযোজনে সহায়তা করছে।
বিদ্যালয়গুলির মানোন্নয়নের জন্য ত্রিপুরা স্কুল কোয়ালিটি অ্যান্ড অ্যাক্রেডিটেশন ফ্রেমওয়ার্ক চালু করা হয়েছে। একইসঙ্গে স্মার্ট ক্লাসরুম ও টিঙ্কারিং ল্যাব গড়ে তুলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষার প্রসার ঘটানো হচ্ছে।
পিএম-শ্রী প্রকল্পের আওতায় ৮৪টি বিদ্যালয়কে মডেল স্কুল হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে, আর বিদ্যাজ্যোতি কর্মসূচির মাধ্যমে ১২৫টি সিবিএসই ধাঁচের মডেল স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এছাড়া “বন্দে ত্রিপুরা” নামে শিক্ষামূলক টেলিভিশন চ্যানেলের মাধ্যমে প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ্যক্রমভিত্তিক শিক্ষা সম্প্রচার করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্যখাতে মুখ্যমন্ত্রী জানান, পোষণ ট্র্যাকার-এর আওতায় তিন লক্ষাধিক আধার-যাচাইকৃত উপভোক্তাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। নীতি আয়োগের সহযোগিতায় স্কুল হেলথ মিশন চালু করে ১২৫টি পাইলট স্কুলে নার্স নিয়োগ করা হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী সুস্থ শৈশব সুস্থ কৈশোর অভিযানের আওতায় শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি উন্নয়নের লক্ষ্যে পরিচালিত আটটি অভিযানে প্রায় ৯৮ শতাংশ কভারেজ অর্জিত হয়েছে।
অ-সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে মুখ্যমন্ত্রী নিরাময় আরোগ্য অভিযান-এর মাধ্যমে ৩০ বছরের ঊর্ধ্বে সমগ্র জনগোষ্ঠীকে স্বাস্থ্য পরীক্ষার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও জানান, রাজ্যের আয়ুষ্মান আরোগ্য মন্দিরগুলি এনকিউএএস সার্টিফিকেশন অর্জন করেছে, যার ফলে শিশু মৃত্যুর হার কমানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য সূচকে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। একইসঙ্গে মেডিক্যাল শিক্ষায়ও উল্লেখযোগ্য সম্প্রসারণ ঘটেছে। এমবিবিএস আসন সংখ্যা ২২৫ থেকে বেড়ে ৫৫০ এবং স্নাতকোত্তর আসন সংখ্যা ৮৫ থেকে ১৯৬-এ উন্নীত হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী জানান, বর্তমানে রাজ্যের ৪.৯৬ লক্ষ গ্রামীণ মহিলা ৫৫,৬৭৬টি স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত। সমৃদ্ধি অভিযান-এর মাধ্যমে মহিলা পরিচালিত গোষ্ঠী ও উদ্যোগগুলিতে ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধি করা হয়েছে।
মহিলা উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে ত্রিপুরা মহিলা উদ্যোক্তা নীতি ২০২৫ প্রণয়ন করা হয়েছে। পাশাপাশি মহিলাদের আইটিআই-তে এসএইচই দক্ষতা ও উদ্যোক্তা কেন্দ্র চালু করা হয়েছে।
এই উদ্যোগগুলির ফলে ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে রাজ্যে মহিলা শ্রমশক্তির অংশগ্রহণের হার ৩৭.৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪৫.৯ শতাংশে পৌঁছেছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করে মহিলাদের রাতের শিফটেও কাজের সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে।
দক্ষতা উন্নয়নের ক্ষেত্রে টাটা টেকনোলজিস-এর সহযোগিতায় আইটিআইগুলিকে আধুনিকীকরণ করা হচ্ছে। শিল্প ৪.০ ভিত্তিক কোর্স, কর্মশালার উন্নয়ন এবং প্রশিক্ষক প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি রামকৃষ্ণ মিশনের সহযোগিতায় ওয়ার্ল্ড স্কিল সেন্টার ও স্কুল অব ল্যাঙ্গুয়েজেস প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী জানান, প্রধানমন্ত্রীর “রিফর্ম এক্সপ্রেস”-এ সামিল হওয়ার আহ্বানে সাড়া দিয়ে ডিরেগুলেশন ও কমপ্লায়েন্স রিডাকশন উদ্যোগের প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ে ত্রিপুরা সমস্ত রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করেছে।
তিনি আরও জানান, গত এক বছরে ত্রিপুরা ৩০,০০০ কোটিরও বেশি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব আকর্ষণ করেছে, যার মধ্যে ৮,০০০ কোটিরও বেশি টাকার প্রকল্প ইতিমধ্যে বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছেছে। ভর্তি এয়ারটেল-সহ একাধিক বড় সংস্থা আগরতলায় ডেটা সেন্টার স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে।
পর্যটন খাতে মাতা ত্রিপুরাসুন্দরী পর্যটন সার্কিট এবং বৌদ্ধ পর্যটন সার্কিট গড়ে তোলার কাজ চলছে। ঐতিহাসিক পুষ্পবন্ত প্যালেসকে আইএইচসিএল-এর তাজ ব্র্যান্ডের অধীনে বিশ্বমানের হেরিটেজ হোটেলে রূপান্তর করা হচ্ছে।
প্রশাসনিক ক্ষেত্রে রাজ্য মন্ত্রিসভা থেকে গ্রাম পঞ্চায়েত পর্যন্ত সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও পেপারলেস কার্যপ্রণালী চালু করেছে। এছাড়া আইজিওটি প্ল্যাটফর্মের সাধনা সপ্তাহ কর্মসূচিতে গ্রুপ-এ রাজ্যগুলির মধ্যে প্রথম স্থান অর্জন করেছে ত্রিপুরা, যা মিশন কর্মযোগীর সাফল্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
যুব সমাজের মধ্যে উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা মনোভাব গড়ে তুলতে স্টেট ইনোভেশন মিশন এবং টি-নেস্ট গঠন করা হয়েছে।
বক্তৃতার শেষে মুখ্যমন্ত্রী অধ্যাপক (ড.) মানিক সাহা মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে “বিকশিত ভারত” গঠনের জাতীয় লক্ষ্যে ত্রিপুরার অটল অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দূরদর্শী নেতৃত্ব এবং নীতি আয়োগের কৌশলগত দিকনির্দেশনায় এই বৈঠকের আলোচনা দেশের সাধারণ মানুষের কল্যাণে বাস্তব ও যুগান্তকারী ফলাফল বয়ে আনবে।
























