নয়াদিল্লি, ১১ জুন (আইএএনএস): ভুয়ো অনলাইন হেলিকপ্টার বুকিং ওয়েবসাইট তৈরি করে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে প্রতারণার মাধ্যমে টাকা হাতিয়ে নেওয়া একটি আন্তঃরাজ্য সাইবার জালিয়াতি চক্রের পর্দাফাঁস করেছে দিল্লি পুলিশের দক্ষিণ জেলার সাইবার থানার দল। এই ঘটনায় তিন অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং তাদের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল তথ্যপ্রমাণ ও একাধিক ইলেকট্রনিক ডিভাইস উদ্ধার করা হয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, এক ব্যক্তি অভিযোগ করেন যে, আইআরসিটিসি-হেলিকপ্টার.কম এবং আইআরসিটিসি-হেলিয়াত্রা.কম নামে দুটি ভুয়ো ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ভ্রমণ পরিষেবা বুকিংয়ের নাম করে তাঁর কাছ থেকে ২০,৩২৮ টাকা প্রতারণা করে নেওয়া হয়েছে। ওয়েবসাইট দু’টি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল যাতে সেগুলি আসল ভ্রমণ বুকিং পোর্টালের মতো দেখায়।
অভিযোগের ভিত্তিতে গত ২১ মে দক্ষিণ জেলার সাইবার থানায় ভারতীয় ন্যায় সংহিতার (বিএনএস) ৩১৮(৪), ৬১(২) এবং ৩(৫) ধারায় মামলা রুজু করে তদন্ত শুরু হয়।
এসআই আশিস, হেড কনস্টেবল প্রবীণ, বিকাশ ও বিনোদ, কনস্টেবল প্রবীণ জুন এবং সুলতানকে নিয়ে গঠিত বিশেষ তদন্তকারী দল এই মামলার তদন্ত চালায়। অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন সাইবার দক্ষিণ জেলার থানার ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক (এসএইচও) ইন্সপেক্টর হংসরাজ স্বামী। গোটা তদন্ত তদারকি করেন দক্ষিণ জেলার অতিরিক্ত ডেপুটি পুলিশ কমিশনার (অপারেশনস) অরবিন্দ কুমার।
তদন্ত চলাকালীন অর্থের লেনদেনের পথ, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের তথ্য, ডোমেন রেজিস্ট্রেশন রেকর্ড, জিমেল অ্যাকাউন্ট, আইপি লগ এবং হোস্টিঙ্গার ও গুগলের মতো পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থার প্রযুক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়।
এই বিশ্লেষণের ভিত্তিতে ভুয়ো ওয়েবসাইট ও সংশ্লিষ্ট ডিজিটাল বিজ্ঞাপন পরিচালনাকারীদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়। প্রযুক্তিগত নজরদারি ও স্থানীয় সূত্রের তথ্যের ভিত্তিতে বিহারের নালন্দা জেলা থেকে ওমপ্রকাশ কুমার ও রোহিত কুমারকে গ্রেফতার করা হয়।
জিজ্ঞাসাবাদে ধৃতরা জানায়, এই চক্রের সঙ্গে শ্রেয়াংশ তিওয়ারি ওরফে শিবম নামে আরও এক ব্যক্তি যুক্ত রয়েছে, যিনি ভুয়ো ওয়েবসাইটগুলির নির্মাতা ও পরিচালনাকারী। পরে উত্তরপ্রদেশের গ্রেটার নয়ডা থেকে তাকেও গ্রেফতার করা হয়।
তদন্তে উঠে এসেছে, অভিযুক্তরা ভুয়ো ভ্রমণ বুকিং পোর্টাল তৈরি করে মেটা (ফেসবুক)-এ অর্থের বিনিময়ে বিজ্ঞাপন দিত। অনলাইনে ভ্রমণ সংক্রান্ত পরিষেবা খুঁজতে গিয়ে বহু মানুষ ওই ভুয়ো ওয়েবসাইটে পৌঁছে প্রতারণার শিকার হন।
পুলিশের দাবি, এই চক্রের সঙ্গে দেশের বিভিন্ন রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে নথিভুক্ত প্রায় ৩০টি অভিযোগের যোগসূত্র পাওয়া গিয়েছে। মোট প্রতারণার পরিমাণ প্রায় ১০ লক্ষ টাকা বলে অনুমান করা হচ্ছে। নালন্দার বাসিন্দা অনুরাগ নামে আরও এক ব্যক্তির ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
অভিযুক্তরা প্রথমে বুকিংয়ের নামে টাকা নিত। পরে বুকিং নিশ্চিতকরণ, রিফান্ড প্রসেসিং, রেজিস্ট্রেশন ফি-সহ নানা ভুয়ো অজুহাতে আরও টাকা আদায় করত। প্রতারণার অর্থ বিভিন্ন ‘মিউল’ ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ও ডিজিটাল পেমেন্ট চ্যানেলের মাধ্যমে ঘুরিয়ে অর্থের উৎস গোপন করার চেষ্টা করা হতো।
অভিযান চালিয়ে পুলিশের হাতে উদ্ধার হয়েছে আটটি মোবাইল ফোন, দুটি ল্যাপটপ এবং একটি দশম প্রজন্মের আইপ্যাড। এছাড়াও একাধিক এটিএম ও ডেবিট কার্ড বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে, যেগুলি সাইবার প্রতারণার কাজে ব্যবহার করা হতো বলে অভিযোগ। মামলার সঙ্গে যুক্ত একটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে থাকা ২০,৩২৮ টাকা ‘লিয়েন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
পুলিশ আরও বিপুল পরিমাণ ডিজিটাল তথ্যপ্রমাণ ও ইলেকট্রনিক নথি উদ্ধার করেছে, যা বর্তমানে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ধৃত ওমপ্রকাশ কুমারের বিরুদ্ধে এর আগেও সাইবার প্রতারণার অভিযোগ রয়েছে। ২০২২ সালে দিল্লির সাইবার নর্থ-ওয়েস্ট থানায় ভারতীয় দণ্ডবিধির ৪২০ ও ৩৪ ধারায় তার বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের হয়েছিল। তবে রোহিত কুমার এবং উত্তরপ্রদেশের জৌনপুরের বাসিন্দা শ্রেয়াংশ তিওয়ারির বিরুদ্ধে আগে কোনও অপরাধমূলক রেকর্ড পাওয়া যায়নি।
এই চক্রের সঙ্গে যুক্ত আরও ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে এবং গোটা নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে দিল্লি পুলিশ।
























