কলকাতা, ৬ জুন (আইএএনএস): আমেরিকা-ইরান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে পাকিস্তান নিজেকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করলেও, বাস্তবে তারা কোনও মধ্যস্থতাকারী নয়, বরং শুধুমাত্র একটি “কুরিয়ার সার্ভিস” বলে মন্তব্য করলেন ভারতের প্রাক্তন সেনাপ্রধান এম. এম. নারাভানে।
শনিবার কলকাতায় সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) নারাভানে বলেন, “কাউকে উপেক্ষা করা হয়েছে কি হয়নি, সেই প্রশ্নই ওঠে না। পাকিস্তান কোনও মধ্যস্থতাকারী নয়। তারা শুধু একটি কুরিয়ার সার্ভিসের মতো কাজ করছে।”
উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক সময়ে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনের ক্ষেত্রে পাকিস্তান নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার দাবিদার হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে।
আমেরিকা-ইরান সংঘাতের সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে বলতে গিয়ে নারাভানে বলেন, জাতীয় নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা পরস্পরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
তাঁর কথায়, “জাতীয় নিরাপত্তা বরাবরই অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। প্রকৃতপক্ষে অর্থনীতিই সবকিছুকে পরিচালিত করে। তাই আমাদের লক্ষ্য সবসময় আত্মনির্ভর ও স্বনির্ভর হওয়া, যদিও তা বৈশ্বিক বাণিজ্যের পরিপ্রেক্ষিতে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যে ধাক্কা বা সংকট তৈরি হয়, তার প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকা সম্ভব নয়। তবে আমরা সরবরাহ ব্যবস্থার উৎস বৈচিত্র্যময় করা এবং দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধির উপর জোর দিচ্ছি, যাতে ভবিষ্যতের যেকোনও ধাক্কার জন্য প্রস্তুত থাকা যায়।”
পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা নতুন কিছু নয়।
“বিশ্ব পরিস্থিতি সবসময় পরিবর্তনশীল। এটি আজকের ঘটনা নয়। অতীতেও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ক্রমাগত বদলেছে। তাই সময়ের দাবি হল পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া। তবে সেই অভিযোজনের সময় দেশের স্বার্থ এবং জনগণের কল্যাণকে সর্বাগ্রে রাখতে হবে। সেটাই যদি আমাদের মূল নীতি হয়, তাহলে নেওয়া সব সিদ্ধান্তই দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ রক্ষা করবে,” বলেন তিনি।
ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকীকরণ প্রসঙ্গে নারাভানে জানান, এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া।
“সামরিক আধুনিকীকরণের কোনও শেষ নেই। সেনা, নৌ ও বায়ুসেনার ধারাবাহিক আধুনিকীকরণের অংশ হিসেবেই এই কাজ চলছে। যতটা সম্ভব দেশীয় প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম ব্যবহারের উপর গুরুত্ব দেওয়া হবে,” বলেন তিনি।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্নের উত্তরে প্রাক্তন সেনাপ্রধান আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ওঠানামা থাকলেও দুই দেশের সম্পর্ক আবার ইতিবাচক পথে এগোচ্ছে।
“দেশগুলির মধ্যে সম্পর্কের ক্ষেত্রে উত্থান-পতন থাকবেই। কোনও নিম্নগতি মানেই নেতিবাচক কিছু নয়। অনেক সময় নিম্ন পর্যায়ের পর আবার ঊর্ধ্বমুখী গতি আসে। আমার বিশ্বাস, ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক আবার উন্নতির দিকেই এগোচ্ছে,” মন্তব্য তাঁর।
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই প্রকল্প এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলছে।
“এতে নতুন কিছু নেই। বাংলাদেশ সীমান্তে বেড়া দেওয়ার কাজ দীর্ঘদিন ধরেই চলছে। নদীবহুল ভূপ্রকৃতির কারণে এটি অত্যন্ত কঠিন সীমান্ত। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের কিছু অংশে যে কাজ বাকি ছিল, তা এখন সম্পন্ন করা হচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে পুরো সীমান্তই বেড়ার আওতায় আসে,” বলেন নারাভানে।
আধুনিক যুদ্ধে ড্রোন ও মানববিহীন আকাশযান (ইউএভি)-এর ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব সম্পর্কেও মন্তব্য করেন তিনি।
নারাভানে বলেন, “শুধু কোয়াডকপ্টার নয়, বিভিন্ন ধরনের ইউএভি সাম্প্রতিক যুদ্ধগুলিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে শুরু করে বর্তমান আমেরিকা-ইরান সংঘাত— সর্বত্রই তার প্রমাণ মিলেছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভারতীয় সেনা, নৌ ও বায়ুসেনা ড্রোন সংগ্রহে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। এই ক্ষেত্রে দেশীয় সংস্থা এবং ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প (এমএসএমই)-গুলির বড় ভূমিকা রয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতের যুদ্ধকৌশলে ড্রোন প্রযুক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে এবং ভারতকে এই ক্ষেত্রে আত্মনির্ভর হতে হবে।



















