পুনে, ৩০ মে (আইএএনএস): আত্মনির্ভরতা ও উদ্ভাবন এখন ভারতের সামরিক প্রস্তুতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হয়ে উঠেছে বলে মন্তব্য করেছেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদী। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী-র ‘জেএআই’ (যৌথতা, আত্মনির্ভরতা এবং উদ্ভাবন) মন্ত্র ভবিষ্যতেও ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর পথনির্দেশক হিসেবে কাজ করবে।
শনিবার পুনেতে জাতীয় প্রতিরক্ষা একাডেমি (এনডিএ)-র ১৫০তম কোর্সের পাসিং আউট প্যারেড (পিওপি) পরিদর্শনের পর সাংবাদিক বৈঠকে জেনারেল দ্বিবেদী বলেন, এই অনুষ্ঠান তাঁর কাছে গর্ব ও আবেগের এক বিশেষ মুহূর্ত, কারণ এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে।
তিনি বলেন, “আজ এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান থেকে ৩৫৩ জন ক্যাডেট উত্তীর্ণ হচ্ছেন, যার মধ্যে ১৮ জন মহিলা ক্যাডেট রয়েছেন। এটি একাডেমি, সশস্ত্র বাহিনী এবং দেশের জন্য অত্যন্ত গর্বের বিষয়।”
সেনাপ্রধান বলেন, প্রতিরক্ষা বাহিনীতে মহিলাদের অংশগ্রহণ ক্রমশ বাড়ছে, যা আধুনিক ভারতের পরিবর্তিত মানসিকতা ও আত্মবিশ্বাসের প্রতিফলন।
“এটি পরিবর্তিত ভারতের আত্মবিশ্বাস এবং জাতীয় প্রতিরক্ষায় নারীদের ক্রমবর্ধমান ভূমিকার প্রতিচ্ছবি,” তিনি বলেন।
ভবিষ্যতের যুদ্ধের চরিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে উল্লেখ করে জেনারেল দ্বিবেদী বলেন, আগামী দিনের সংঘাত আর শুধুমাত্র প্রচলিত যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকবে না। স্থল, আকাশ ও সমুদ্রের পাশাপাশি মহাকাশ, সাইবার, ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক এবং কগনিটিভ ডোমেনেও যুদ্ধ পরিচালিত হবে। ফলে সশস্ত্র বাহিনীকে আরও জটিল নিরাপত্তা পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।
তিনি ২০২৫ সালের ৭ মে পাকিস্তান এবং পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরের সন্ত্রাসবাদী পরিকাঠামোর বিরুদ্ধে পরিচালিত ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর প্রসঙ্গও উল্লেখ করেন।
জেনারেল দ্বিবেদী বলেন, “অপারেশন সিঁদুর ভারতের দৃঢ় সংকল্প এবং সশস্ত্র বাহিনীর নির্ভুল, পরিকল্পিত ও লক্ষ্যভিত্তিক প্রতিক্রিয়া জানানোর সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছে। এই অভিযান সমন্বিত পরিকল্পনা, রিয়েল-টাইম গোয়েন্দা তথ্য, নির্ভুল লক্ষ্যভেদ, শক্তিশালী বিমান প্রতিরক্ষা, সুরক্ষিত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন ডোমেনের মধ্যে সমন্বয়ের গুরুত্ব তুলে ধরেছে।”
তিনি বলেন, যুদ্ধের পরিবর্তিত রূপ সম্পর্কে ভারতীয় সেনাবাহিনী সম্পূর্ণ সচেতন এবং ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নিজেদের ‘ফিউচার-রেডি ফোর্স’-এ রূপান্তরিত করছে।
“এই রূপান্তরের যাত্রায় তরুণ অফিসার ও জওয়ানদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে,” বলেন তিনি।
সেনাবাহিনীর আধুনিকীকরণ কর্মসূচির বিভিন্ন দিক তুলে ধরে সেনাপ্রধান জানান, মাল্টি-ড্রোন ব্যাটালিয়ন, দিব্যাস্ত্র ব্যাটারি, শক্তিমান রেজিমেন্ট, ভৈরব ব্যাটালিয়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর অন্যান্য কাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে। আগামী বড় পদক্ষেপ হবে নেটওয়ার্কিং ও ডেটা-কেন্দ্রিক সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি।
আত্মনির্ভরতা ও উদ্ভাবনের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, “সেনাবাহিনীর প্রস্তুতির কেন্দ্রবিন্দুতেই রয়েছে আত্মনির্ভরতা ও উদ্ভাবন।”
এই লক্ষ্য অর্জনে সেনাবাহিনী দেশের বিভিন্ন অংশীদারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
“জাতীয় সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গির অংশ হিসেবে আমরা প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা (ডিআরডিও), শিল্পক্ষেত্র, স্টার্ট-আপ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং জাতীয় সংস্থাগুলির সঙ্গে কাজ করছি, যাতে দেশীয় উদ্ভাবনকে যুদ্ধক্ষেত্রের সক্ষমতায় রূপান্তর করা যায়। এই ক্ষেত্রেই প্রধানমন্ত্রীর ‘জেএআই’ মন্ত্র আমাদের পথ দেখাবে,” বলেন জেনারেল দ্বিবেদী।
তিনি আরও বলেন, সেনাবাহিনীর ভূমিকা শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়। সীমান্ত সুরক্ষা, দুর্যোগ মোকাবিলা, আর্মি গুডউইল স্কুলের মাধ্যমে শিক্ষা, দুর্গম এলাকার বাসিন্দাদের সহায়তা এবং যুব উন্নয়নমূলক বিভিন্ন কর্মসূচিতেও সশস্ত্র বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
“একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী দেশকে শক্তি দেয় এবং একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি সেনাবাহিনীকে শক্তি জোগায়,” বলেন তিনি।
প্রাক্তন সেনাকর্মী, বীরনারী, নির্ভরশীল পরিবার এবং সেনা সদস্যদের পরিবার সম্পর্কে জেনারেল দ্বিবেদী বলেন, “তাঁরা সবাই সেনা পরিবারের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁদের মর্যাদা, কল্যাণ ও সম্মান রক্ষা করা আমাদের পবিত্র দায়িত্ব।”
শেষে তিনি এনডিএ-র উত্তীর্ণ ক্যাডেটদের অভিনন্দন জানিয়ে দেশসেবার আদর্শ, নেতৃত্বের গুণাবলি এবং জাতির প্রতি অঙ্গীকার বজায় রেখে ভবিষ্যতের পথচলা শুরু করার আহ্বান জানান।



















