নয়াদিল্লি, ১৪ জুলাই : ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)-র (সিপিআই(এম)) কেন্দ্রীয় কমিটির তিনদিনের বৈঠক ১১ থেকে ১৩ জুলাই নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠক শেষে প্রকাশিত প্রেস বার্তায় দেশের অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা আইন, দুর্নীতির অভিযোগ, নাগরিকত্ব, নির্বাচনী সংস্কার, সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, কৃষক-শ্রমিকদের সমস্যা এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি-সহ একাধিক বিষয়ে কেন্দ্রের বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকারের তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন ইস্যুতে দেশব্যাপী আন্দোলনের কর্মসূচিও ঘোষণা করেছে দল।
সিপিআই(এম)-এর দাবি, কেন্দ্রের উন্নয়নের দাবির বিপরীতে দেশের অর্থনীতি সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে। দলের বক্তব্য অনুযায়ী, রিজার্ভ ব্যাঙ্কের জুন মাসের বুলেটিনে ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে প্রকৃত জিডিপি বৃদ্ধির হার ৬.৬ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যা আগের বছরের ৭.৭ শতাংশের তুলনায় কম। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতের প্রবৃদ্ধি কমেছে, বেকারত্ব উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে এবং বিভিন্ন রাজ্যে ইউরিয়াসহ সার সংকট দেখা দিয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা আইন (এনএফএসএ)-এ প্রস্তাবিত সংশোধনের বিরোধিতা করেছে সিপিআই(এম)। দলের অভিযোগ, অন্ত্যোদয় অন্ন যোজনার সুবিধাভোগী নির্ধারণে পরিবারভিত্তিক পদ্ধতির পরিবর্তে মাথাপিছু ভিত্তিক ব্যবস্থা চালু হলে দরিদ্র পরিবারগুলির খাদ্য প্রাপ্যতা কমে যাবে। বিশেষ করে দক্ষিণের রাজ্যগুলি এর ফলে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে দলের দাবি। সরকার সংশোধনী এগিয়ে নিয়ে গেলে দেশজুড়ে আন্দোলনের হুঁশিয়ারিও দিয়েছে সিপিআই(এম)।
অযোধ্যার রামমন্দিরের অনুদান আত্মসাতের অভিযোগ এবং কেন্দ্রীয় কৃষি প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে সরকারি অর্থ অপব্যবহারের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছে সিপিআই(এম)। দলের বক্তব্য, দোষীদের পদমর্যাদা নির্বিশেষে শাস্তি দিতে হবে।
কেন্দ্রের গঠিত উচ্চ পর্যায়ের জনসংখ্যাগত পরিবর্তন কমিশন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সিপিআই(এম)। দলের অভিযোগ, জনসংখ্যাবিদ ছাড়াই কমিশন গঠন করা হয়েছে এবং এর মাধ্যমে আরএসএসের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে।
এছাড়া, বিদেশ মন্ত্রকের পাসপোর্ট নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়, এই অবস্থানেরও সমালোচনা করেছে দল। সিপিআই(এম)-এর দাবি, এই পদক্ষেপ সিএএ, এনআরসি এবং বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়ে নাগরিকত্বের প্রশ্নে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে।
বিজেপির বিরুদ্ধে বিরোধী দল ভাঙিয়ে সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের চেষ্টা করার অভিযোগ তুলেছে সিপিআই(এম)। দলের দাবি, এই ধরনের পদক্ষেপ গণতন্ত্র, সংবিধান এবং দলত্যাগ বিরোধী আইনের পরিপন্থী।
বিভিন্ন রাজ্যে বহুজাতিক সংস্থা ও তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থার জন্য কম দামে জমি বরাদ্দ দিয়ে দীর্ঘদিনের বাসিন্দাদের উচ্ছেদ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে সিপিআই(এম)। দলের মতে, ডেটা সেন্টার স্থাপনের ফলে ভূগর্ভস্থ জলের উপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
গুজরাট পুলিশের নতুন স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি)-কে সংখ্যালঘুদের লক্ষ্য করে নজরদারির হাতিয়ার বলে অভিযোগ করেছে সিপিআই(এম)। দলের দাবি, এটি মৌলিক অধিকার ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার পরিপন্থী।
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকারের সমালোচনা করে সিপিআই(এম) দাবি করেছে, ক্ষমতায় আসার অল্প সময়ের মধ্যেই সরকারের কর্তৃত্ববাদী চরিত্র প্রকাশ পেয়েছে। হকার উচ্ছেদ, বিরোধী দলের কর্মসূচিতে বাধা এবং দলীয় কার্যালয়ে হামলার অভিযোগও করেছে দল।
অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার সাম্প্রতিক মন্তব্যের সমালোচনা করে সিপিআই(এম) জানিয়েছে, এ ধরনের বক্তব্য গণতান্ত্রিক পরিবেশের পরিপন্থী। একই সঙ্গে কেরলের কংগ্রেস সরকার কর্পোরেটপন্থী নীতি গ্রহণ করছে বলে অভিযোগ করেছে দল। পূর্ববর্তী এলডিএফ সরকারের কল্যাণমূলক প্রকল্পগুলি দুর্বল করার যে কোনও প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছে সিপিআই(এম)।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ)-এর স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সিপিআই(এম)। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কমলেও দেশে জ্বালানি ও রান্নার গ্যাসের দাম কমানো হয়নি বলে কেন্দ্রের সমালোচনা করেছে দল। কৃষকদের জন্য ইউরিয়াসহ পর্যাপ্ত সার সরবরাহেরও দাবি জানানো হয়েছে।
সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল পর্যালোচনা করে প্রচার, প্রার্থী নির্বাচন ও রাজনৈতিক বার্তা তুলে ধরার ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা স্বীকার করেছে সিপিআই(এম)। আগামী দিনে সংশোধনী কর্মসূচি গ্রহণের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
এছাড়া, নির্বাচন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার দাবিতে দেশব্যাপী প্রচার, সংসদ ও বিধানসভায় মহিলাদের সংরক্ষণ কার্যকর করার দাবিতে আন্দোলন, যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশনীতি বিরোধী প্রচার, শ্রমিক-কৃষক সংগঠনের আন্দোলনে সমর্থন এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে ছাত্র আন্দোলনের প্রতি সমর্থনের কথা জানিয়েছে সিপিআই(এম)। দলের পক্ষ থেকে ছাত্রনেতা সোনম ওয়াংচুকের অনশন নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।



















