নয়াদিল্লি, ৩০ মে (আইএএনএস): শক্তিশালী পরিষেবা রফতানি, পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার এবং স্থিতিশীল শ্রমবাজারের কারণে মে মাসে ভারতের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ‘সতর্ক আশাবাদী স্থিতিশীলতা’র পরিচয় দিয়েছে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রক। তবে আন্তর্জাতিক জ্বালানির উচ্চ মূল্য, টাকার অবমূল্যায়ন, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং স্বাভাবিকের তুলনায় দুর্বল বর্ষার সম্ভাবনার কারণে নীতিগত সতর্কতা বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
শনিবার প্রকাশিত অর্থ মন্ত্রকের ‘মাসিক অর্থনৈতিক পর্যালোচনা’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে প্রবৃদ্ধির গতি বজায় রাখা এবং মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে আর্থিক, মুদ্রানীতি ও কাঠামোগত সংস্কারের ক্ষেত্রে দ্রুত ও নমনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। কারণ বৈশ্বিক পরিস্থিতি এখনও অনিশ্চিত।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত ইতিমধ্যেই নড়বড়ে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের ওপর বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা দিয়েছে। এর প্রভাব জ্বালানি বাজার, সরবরাহ ব্যবস্থা, বাণিজ্যিক রুট এবং বৈশ্বিক আর্থিক পরিস্থিতিতে ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে।
জ্বালানি, পরিবহণ ও লজিস্টিক খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় বিশ্বের বহু দেশে মূল্যস্ফীতির চাপ ফের বেড়েছে এবং ‘স্ট্যাগফ্লেশন’ বা স্থবির অর্থনীতির সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতির আশঙ্কাও জোরালো হয়েছে। প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি সরবরাহে দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন ঘটলে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি আরও দুর্বল হতে পারে।
ভারতের ক্ষেত্রেও এই আন্তর্জাতিক চাপ ধীরে ধীরে দেশের অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।
পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে ভারতের অর্থনীতি প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে। ই-ওয়ে বিল উৎপাদন, পারচেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্স (পিএমআই) এবং বিদ্যুৎ ব্যবহার বৃদ্ধির ধারায় ছিল। তবে আটটি মূল শিল্পের সূচক এবং জ্বালানি ব্যবহারে কিছুটা মন্থরতা দেখা গেছে, যা বৈশ্বিক প্রতিকূলতার প্রভাবের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, খুচরো ও পাইকারি মূল্যস্ফীতির মধ্যে পার্থক্য ক্রমশ বাড়ছে। এপ্রিল মাসে খুচরো মূল্যস্ফীতি সামান্য বেড়ে ৩.৪৮ শতাংশে পৌঁছালেও তা এখনও ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংক (আরবিআই)-এর নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার নিচে রয়েছে।
তবে খাদ্যপণ্য, রেস্তোরাঁ ও আবাসন পরিষেবার মতো কিছু ক্ষেত্রে মূল্যবৃদ্ধির চাপ লক্ষ্য করা গেছে। অন্যদিকে, পাইকারি মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮.৩ শতাংশে পৌঁছেছে, যার প্রধান কারণ আন্তর্জাতিক জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, টাকার অবমূল্যায়ন এবং নিম্ন ভিত্তি-প্রভাব।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উৎপাদন পর্যায়ে মূল্যবৃদ্ধির এই চাপ আগামী মাসগুলিতে পরিবহণ, জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের খরচ বাড়িয়ে খুচরো মূল্যস্ফীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।
এছাড়া ভারত আবহাওয়া বিভাগ (আইএমডি) চলতি মৌসুমে দীর্ঘমেয়াদি গড়ের প্রায় ৯২ শতাংশ বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দিয়েছে। যদিও বর্তমানে চাল ও গমের মজুত ৮১৭.৫৩ লক্ষ টনে রয়েছে এবং জলাধারগুলিতেও পর্যাপ্ত জল সংরক্ষিত আছে, তবুও বৃষ্টির ঘাটতি দেখা দিলে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে। এর ফলে গ্রামীণ চাহিদা ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শিল্পোৎপাদনের ক্ষেত্রেও এপ্রিল মাসে কিছুটা মন্থরতা দেখা গেছে, বিশেষত বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা এবং হাইড্রোকার্বন খাতের দুর্বলতার কারণে। তবে সিমেন্ট, ইস্পাত এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে, যা অবকাঠামো ও নির্মাণ খাতে শক্তিশালী চাহিদার প্রতিফলন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, উৎপাদন খাতে ইনপুট খরচ বৃদ্ধি পেলেও এইচএসবিসি ইন্ডিয়া ম্যানুফ্যাকচারিং পিএমআই সম্প্রসারণের পর্যায়েই রয়েছে। পাশাপাশি গাড়ি, সেমিকন্ডাক্টর, ইলেকট্রনিক্স এবং প্রতিরক্ষা উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, রফতানি আদেশের উন্নতি এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির প্রবণতা শিল্পক্ষেত্রের ভিত মজবুত থাকার ইঙ্গিত দেয়।
আর্থিক খাতে বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগকারীদের (এফপিআই) অর্থ প্রত্যাহারের কারণে টাকার ওপর চাপ তৈরি হলেও বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) প্রবাহ শক্তিশালী রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে মোট এফডিআই প্রবাহ ৯৪.৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা একটি রেকর্ড। এটি ভারতের অর্থনীতির প্রতি দীর্ঘমেয়াদি আন্তর্জাতিক আস্থার প্রতিফলন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
একইসঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডারও স্বস্তিদায়ক অবস্থানে রয়েছে, যা বৈশ্বিক অস্থিরতার বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা বলয় হিসেবে কাজ করছে।
শ্রমবাজারের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক চিত্র তুলে ধরে অর্থ মন্ত্রক জানিয়েছে, কর্মসংস্থান এবং শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার স্থিতিশীল রয়েছে। উৎপাদন ও পরিষেবা খাতে নিয়োগের গতি অব্যাহত থাকায় শ্রমবাজারে স্থায়িত্ব বজায় রয়েছে।



















