News Flash

  • Home
  • সম্পাদকীয়
  • আলোর ঠিকানা মানসিক হাসপাতালে নেশামুক্তি কেন্দ্র বি ফার্মাসি পাশ যুবকের হেরোইনের নেশা মুক্ত হয়ে নতুন জীবনের সন্ধান
Image

আলোর ঠিকানা মানসিক হাসপাতালে নেশামুক্তি কেন্দ্র বি ফার্মাসি পাশ যুবকের হেরোইনের নেশা মুক্ত হয়ে নতুন জীবনের সন্ধান

।। পারিজাত দত্ত।।

হতাশা, অর্থাভাব, সাংসারিক অশান্তি, অতিরিক্ত ভোগ-লিপ্সা, নাকি মনের জোর কমে যাওয়া, এর মধ্যে দায়ি কারণ কোনটা? নেশার আসক্তিতে বুঁদ হয়ে এক কল্পিত জগতের বাসিন্দা হয়ে যাচ্ছে যুব প্রজন্মের একাংশ। এর কারণ যেমন খুঁজতে হবে, তেমনি এই নেশার কবল থেকে মুক্তি পেয়ে জীবনকে আবার নতুনভাবে শুরু করার অনুপ্রেরণা লাভ করাও জরুরী। সেক্ষেত্রে নরসিংগড়স্থিত মডার্ন সাইক্রিয়াটিক হাসপাতাল নেশামুক্তির আরোগ্য নিকেতন। যারা হেরোইন, ব্রাউন সুগার সহ বিভিন্ন নেশায় আসক্ত, এমন ২৬২ জন নেশামুক্ত হবার প্রতিজ্ঞা নিয়ে নিয়মিতভাবে মডার্ন সাইক্রিয়াটিক হাসপাতালের ওএসটি ক্লিনিকে ওষুধ নিচ্ছেন। সেখানে চিকিৎসা করে এখন সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছেন বি ফার্মাসি পাশ এক যুবক, যিনি এখন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে

কর্মরত।

সেই যুবক বলছিল, “যারা ভুল করে নেশাসক্ত হয়েছিল, পরে এই ওএসটি ক্লিনিকে এসে ওষুধ খাচ্ছেন, কিংবা খেয়ে ভাল হয়েছেন, তাদের কাছে এটি একটি মন্দিরের মত। কারণ, নেশা

যারা করতেন তারা এখানে চিকিৎসা লাভ করে নতুন করে জীবনকে গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন।” সেই যুবক বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান। বাবা সরকারি চাকরি করতেন। মেধাবী ছাত্র। একাদশ শ্রেণীতে সে যখন পড়ে, তখন বাবা হঠাৎ মারা গেলেন। তারপর উচ্চমাধ্যমিকে প্রথম বিভাগে পাশ করল সে। ঠিক তখনই তার জীবন একটি বাঁক নিয়ে নিল। একটি শিক্ষিতা মেয়ে এল তার জীবনে। ঝোঁকের মাথায় কুড়ি বছর বয়সে বিয়েও করে ফেলল সে। এরপর বি ফার্মাসি কোর্স করতে বাইরে গেল। দু’বছরের মধ্যে পুত্র সন্তানের পিতাও হল। এরপর একের পর এক পারিবারিক ঝামেলাতে জর্জরিত হল সে। তখন সে যাকে বলে কাঠবেকার। রোজগার নেই। সন্ধ্যার পর শহরের প্রাণকেন্দ্রে আড্ডায় বন্ধুদের সান্নিধ্যে হতাশার কথা সে খুলে বলে একদিন। তখন তার রাত্রে দু’চোখে ঘুম আসে না। মাথার ভেতর বিজবিজ করে হাজারো দুশ্চিন্তা।

মন ভালো নেই তখন তার। তখনই আড্ডার এক বন্ধু বুদ্ধি দেয় তাকে কৌটোর (হেরোইন) নেশা করার। পার্টি-ফার্টিতে, মদ্যপানে হাতে খড়ি হলেও তা অনিয়মিত। ধুমপানও করে না সে। কিন্তু দেখা গেল আড্ডার অনেকেই এই নেশা করে। তাকে তারাই হেরোইন কিনে নেশা করালো। নেশা করার পর মনে হত এক অন্য জগতে চলে গিয়েছে সে। নিয়মিত চলতে লাগলো নেশা। একদিন পার হলেই তখন তার মাথা কেমন করত, শরীর ছটফট করত, নেশার উপর আকর্ষণে সে

তখন তলিয়ে যেতে শুরু করল। প্রতিদিন ফয়েল প্যাকে আগুন দিয়ে ধোঁয়া টেনে নিত সেই যুবক। প্রথমে দিনে এক-দু’বার, পরে বার বার ‘শট’ (ধোঁয়া টেনে) এর মাধ্যমে নেশা করতে হত। নিজের নেশার খরচ, বন্ধু বান্ধবদের নেশার খরচের যোগান দিতে হত প্রয়াশই। এত টাকা আসবে কোথা থেকে? কখনও কখনও দু’তিন দিনের খরচ হিসেবে কুড়ি হাজার টাকা একসঙ্গে মিটিয়েছে সে। সে জানিয়েছে, ২০২১ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে এই নেশার পেছনে তার কুড়ি লক্ষ টাকা অপচয় হয়েছে।

সে এই নেশার খরচ যোগাতে বাড়িঘরের জিনিসপত্র, মায়ের সোনার গয়না চুরি করেছে। ঘরে যা পেত, তাই চুরি করে বিক্রি করত সে। টিভি সেট থেকে শুরু করে নগদ টাকা ইত্যাদি তো ছিলই, এমনকি বাবার বহু কষ্টে কেনা জমিও একদিন বিক্রি করল সে।

তার অবস্থা দেখে মা অতিষ্ঠ হয়ে পড়ল ধীরে ধীরে। এদিকে শরীর প্রতিশোধ নিতে শুরু করল। জ্বালাপোড়া সারা দেহে, যখন তখন মাথা-গরম, মাথার ভেতর যেমন কেমন কেমন করে তার। শ্বাসকষ্ট দেখা দিল। নেশা না করলে পেটে ব্যথা হত। রাতে ঘুমের মধ্যে পায়ে খিচুনি। বহুদিন ধরেই ছেলের অসহ্য যন্ত্রণা সহ্য করতে পারছিল না মা।

নেশাগ্রস্ত যুবকটি বুঝতে পারছিল যে তার ঘুরে দাঁড়াতেই হবে। মা-ই নিয়ে গেলেন ২০২১ সালে মডার্ন সাইক্রিয়াটিক হাসপাতালের চিকিৎসক ডাঃ উদয়ন মজুমদারের কাছে। ২০১৮ সাল থেকেই সেখানে চালু রয়েছে ড্রাগস ট্রিটমেন্ট সেন্টার। ডাঃ উদয়ন মজুমদার নোডাল অফিসার সেন্টারের। তিনি তাকে কাউন্সিলিং করলেন। তিনি বললেন, রবিবার ছাড়া প্রতিদিন তাকে ড্রাগস

ট্রিটমেন্ট সেন্টারে যেতে হবে। সে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলো। তার কথায়, “আমার ছেলেটির দিকে তাকিয়ে আমার মনে হল ঘুরে

দাঁড়াতেই হবে।” প্রতিদিন সকালে নেশা মুক্তি কেন্দ্রে যেত সে। সেখানে বহির্বিভাগে ওএসটি ক্লিনিকের নার্সিং

স্টাফ সানি সেনগুপ্ত তাকে চিকিৎসকের নির্দেশ অনুয়ায়ী ওষুধ খাইয়ে দিত। প্রতিদিন নিয়ম করে ওষুধ খেত সে। শুধু শনিবারে তার হাতে রবিবারের জন্য ওষুধ দিতে দিত তারা।

শুরু হলো তার ঘুরে দাঁড়াবার লড়াই। নিয়ম করে প্রতিদিন সকালে নরসিংগড় যেত সে।

নেশা মুক্তি কেন্দ্রে নার্সিং স্টাফ ওষুধ খাওয়াতো তাকে। পাল্টে যেতে লাগল তার জীবন। ২০২২ সালে একটি নামকরা বেসরকারি কোম্পানিতে চাকুরি পেল সে। তারপরও প্রতিদিন গিয়ে ওষুধ খেত সো ভাল তাকে হতেই হবে। দেড় বছর টানা চিকিৎসার পর সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে গেল সে। আর এই সর্বনাশা নেশা তাকে আকর্ষণ করতে পারে না। তার তছনছ হয়ে যাওয়া জীবনে তখন নতুন আশার কুঁড়িরা জেগে উঠেছে। তার শিশু সন্তান কবে যে বড় হয়ে গেছে, সে বলতেও পারে না। স্কুলপড়ুয়া ছেলেকে বুকে আঁকড়ে ধরল সে, ছেলেই এখন ধ্যান-জ্ঞান তার। জীবনের মানে কি তার কাছে স্পষ্ট এখন।

তার কথায়, “কেউ যদি নিজে অনুভব করতে পারে যে সে ভুল করেছে, মনকে স্থির রাখতে পারে, তাহলেই সে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে পারবে, ফিরে আসতে পারবে সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে’। সে জানে এই সর্বনাশা নেশা তরুণ প্রজন্মকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। নেশা সামগ্রী

বিক্রি করে একটা শ্রেণীর মানুষ ছারখার করে দিচ্ছে বহু মানুষের জীবন। যুবক বলল, নেশা মুক্তির কেন্দ্রে স্যাররা আপ্রাণ চেষ্টা করছেন, কাউন্সেলিং করাচ্ছেন। তবে হাসপাতালের ভেতরের পরিবেশ যেমন সুন্দর, আমাদের সমাজকেও তেমনি নির্মল রাখতে হবে’।

মডার্ন সাইক্রিয়াটিক হাসপাতালে ২০১৮ সালে চালু হওয়া ড্রাগস্ ট্রিটমেন্ট সেন্টার ২০২৩ সালে রূপান্তরিত হয়েছে এডিকসন ট্রিটমেন্ট ফেসিলিটি (এটিএফ)তে। এখন এর নোডাল অফিসার ডা. দীপায়ন সরকার। সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪ টা পর্যন্ত ওপিওড সাবস্টিটিউশন থেরাপি প্রদান করার ব্যবস্থা রয়েছে এখানে। এই সেন্টারটিতে গিয়ে নেশামুক্ত হোক এ রাজের নেশাসক্ত যুবক- যুবতীরা, এটাই চায় এই নেশামুক্ত যুবক। সে এখন আলোর সহযাত্রী। অন্ধকার থেকে আলোর

ঠিকানায় যাবার পথের সন্ধান সে পেয়ে গেছো সে চায় ওপিওড সাবস্টিটিউশন থেরাপি নেবার এই পথে হেঁটে নেশার করাল থাবা থেকে মুক্তি পান নেশাসক্ত যুবক যুবতীরা।

Releated Posts

১২৬২ থেকে পশ্চিমবঙ্গের নদিয়ার রানাঘাটে পূজিত হচ্ছেন বুড়ো মা

শিবানী বন্দ্যোপাধ্যায় দেবী দুর্গার এই পুজোর সূচনা সেই ১২৬২ খ্রিষ্টাব্দে। স্বাভাবিকভাবেই প্রাচীনত্বের নিরিখে এ পুজো হার মানাতে পারে…

ByByadmin Sep 27, 2025

দুই দিনের শিশুর বিরল রোগ, অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবন ফিরে দিলেন ডাঃ অনিরুদ্ধ বসাক

আগরতলা, ১৫ মার্চ: মাত্র দুইদিনের শিশুর পেটের বাইরে থাকা অন্ত্রকে স্বাভাবিক করে তুললেন ত্রিপুরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু…

ByByadmin Mar 15, 2025

সহজসাধ্য উদ্ভাবনে ভাবিকালে শক্তির যোগানদার ভারতের যুগান্তকারী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্ত্বা

নয়াদিল্লি, ২০২৫: ভারত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্ত্বায় রূপান্তরণমূলক বিপ্লবের সাক্ষী থাকছে, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দূরদর্শী নেতৃত্ব। ভারতের…

ByByadmin Feb 13, 2025

বিকাশের নতুন যুগকে আলিঙ্গন, উন্নয়নের ৫০ বছর উদযাপন করছে উত্তর পূর্বাঞ্চল পর্ষদ (এনইসি)

আগরতলা, ২০ ডিসেম্বর ২০২৪ : প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী একবার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে বলেছিলেন, “দেশের পশ্চিম অঞ্চল যদি…

ByByadmin Dec 20, 2024

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top