নয়াদিল্লি, ১৫ সেপ্টেম্বর (আইএএনএস): বিবাহের জন্য সঙ্গী খুঁজছেন এমন পুরুষদের প্রতারণার উদ্দেশ্যে আগ্রায় একটি কল সেন্টার থেকে পরিচালিত প্যান-ইন্ডিয়া সাইবার জালিয়াতি চক্রের পর্দাফাঁস করল দিল্লি পুলিশের সেন্ট্রাল ডিস্ট্রিক্ট সাইবার পুলিশ। একটি নামী বিবাহ-পরিচয় পোর্টাল ‘শাদি পার্টনার ডট কম’-এর আড়ালে চলা এই চক্রের মূলচক্রী হিসেবে এক আইনজীবীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাঁর সঙ্গে অপারেশনাল ম্যানেজার হিসেবে কাজ করা এক মহিলাকেও গ্রেফতার করা হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্তরা ভুয়ো প্রোফাইল তৈরি করে এবং ইন্টারনেট থেকে মহিলাদের ছবি সংগ্রহ করে সম্ভাব্য পাত্রদের সঙ্গে যোগাযোগ করত। বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করতে মহিলাদের পরিচয় দিয়ে ফোনে কথোপকথনও করানো হতো। প্রতিটি ব্যক্তির কাছ থেকে তুলনামূলকভাবে কম টাকা নিয়ে বেশি সংখ্যক মানুষকে প্রতারণা করাই ছিল চক্রটির কৌশল। সাধারণত একজন ভুক্তভোগীর কাছ থেকে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার টাকা নেওয়া হতো।
ন্যাশনাল সাইবার ক্রাইম রিপোর্টিং পোর্টাল (এনসিআরপি)-এ এক ব্যক্তির অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু হয়। অভিযোগে বলা হয়, শাদি পার্টনার ডট কম-এর মাধ্যমে বিবাহের সম্বন্ধ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাঁকে প্রতারণা করা হয়েছে। এই অভিযোগের ভিত্তিতে সেন্ট্রাল জেলার সাইবার থানায় ভারতীয় ন্যায় সংহিতার (বিএনএস) ৩১৮(৪), ৩১৭(৫), ৬১(২) এবং ৩(৫) ধারায় এফআইআর নম্বর ৭৮/২০২৫ নথিভুক্ত করা হয়।
তদন্তে জানা যায়, প্রায় এক বছর ধরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিবাহের জন্য সঙ্গী খোঁজা পুরুষদের নিশানা করছিল এই চক্র। প্রথমে হোয়াটসঅ্যাপ-এর মাধ্যমে আকর্ষণীয় মহিলাদের ছবি পাঠানো হতো। এরপর সম্ভাব্য পাত্রদের সঙ্গে ফোনে মহিলাদের কথোপকথন করিয়ে সত্যিকারের বিবাহ-পরিচয় পরিষেবা দেওয়া হচ্ছে বলে বিশ্বাস তৈরি করা হতো।
কোনও ব্যক্তি আবেগগতভাবে জড়িয়ে পড়লে বা বিয়েতে আগ্রহ প্রকাশ করলে বিভিন্ন অজুহাতে টাকা নেওয়া শুরু হতো। রেজিস্ট্রেশন চার্জ, প্রোফাইল অ্যাক্সেস ফি, প্রোফাইল অ্যাক্টিভেশন চার্জ এবং যোগাযোগের তথ্য আনলক করার মতো নানা কারণ দেখিয়ে অর্থ আদায় করা হতো। তদন্তাধীন মামলায় অভিযোগকারীকে ১৫ হাজার টাকা প্রতারণা করে নেওয়া হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।
প্রযুক্তিগত তদন্ত ও আর্থিক লেনদেনের সূত্র ধরে পুলিশ জানতে পারে, অভিযোগকারীর কাছ থেকে প্রতারণা করে নেওয়া পুরো অর্থ সেন্ট্রাল ব্যাংক অফ ইন্ডিয়ার একটি কারেন্ট অ্যাকাউন্টে জমা হয়েছিল। অ্যাকাউন্টটি ‘মেসার্স শাদি পার্টনার ডট কম’ নামে একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের নামে নথিভুক্ত ছিল। ব্যাংক রেকর্ড ও কেওয়াইসি তথ্য অনুযায়ী, জয়া শাক্য ওরফে শশী ছিলেন ওই প্রতিষ্ঠানের একমাত্র মালিক ও অনুমোদিত স্বাক্ষরকারী।
এনসিআরপি-এর তথ্য বিশ্লেষণ করে পুলিশ আরও জানতে পারে, একই ব্যাংক অ্যাকাউন্টের সঙ্গে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দায়ের করা ছয়টি অভিযোগের যোগসূত্র রয়েছে। পুলিশের দাবি, এর ফলে দেশজুড়ে পুরুষদের নিশানা করে একই কায়দায় পরিচালিত একটি সক্রিয় ও সমন্বিত প্রতারণা চক্রের অস্তিত্বের প্রমাণ মেলে।
তদন্তের ভিত্তিতে ৪ সেপ্টেম্বর আগ্রার সিকান্দ্রা এলাকার রামাজি ধাম অ্যাপার্টমেন্টের ২৫ নম্বর সম্পত্তিতে অভিযান চালায় দিল্লি পুলিশের একটি দল। সেখানে বেআইনিভাবে পরিচালিত একটি সক্রিয় টেলিকলিং কল সেন্টারের সন্ধান পাওয়া যায়। ঘটনাস্থল থেকেই অপারেশনাল ম্যানেজার এবং প্রতিষ্ঠানের নথিভুক্ত মালিক জয়া শাক্যকে গ্রেফতার করা হয়। পাশাপাশি আটজন মহিলা টেলিকলারকেও আটক করা হয়।
জয়াকে দিল্লিতে নিয়ে এসে জিজ্ঞাসাবাদের পর তদন্তকারীরা এই চক্রের মূলচক্রী হিসেবে ২৯ বছর বয়সি আইনজীবী অমিত কুমারের পরিচয় জানতে পারেন। পুলিশের দাবি, অমিত কুমার বিএ এলএলবি ডিগ্রিধারী এবং এই ভুয়ো বিবাহ-পরিচয় কল সেন্টারের প্রকৃত মালিক ও মূলচক্রী।
তদন্তকারীদের অভিযোগ, নিজের আইনজীবী পরিচয় ও আইনি নথিপত্রের জ্ঞান ব্যবহার করে অমিত এমন একটি কাঠামো তৈরি করেছিলেন, যাতে সরাসরি তাঁর দিকে পুলিশের নজর না যায়। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও সিম কার্ড সংগ্রহের মতো বিষয়গুলি জয়া শাক্যার মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের নামে রাখা হয়েছিল। অমিত নিজেকে প্রতিষ্ঠানের ‘লিগ্যাল অ্যাডভাইজার’ হিসেবে পরিচয় দিতেন বলেও পুলিশ জানিয়েছে।
৪ সেপ্টেম্বর আগ্রার কল সেন্টারে পুলিশের অভিযান হয়েছে জানতে পেরে অমিত মোবাইল ফোন বন্ধ করে আত্মগোপন করেন। এরপর প্রযুক্তিগত নজরদারির মাধ্যমে পুলিশ তাঁর গতিবিধি শনাক্ত করে। ৮ সেপ্টেম্বর আগ্রার কালা কুঞ্জ এলাকায় কালো রঙের একটি হুন্ডাই ক্রেটা গাড়িতে তাঁকে আটক করা হয়। গাড়ির উইন্ডশিল্ডে ‘আইনজীবী’ স্টিকার লাগানো ছিল।
পুলিশের দাবি, অমিত উত্তরপ্রদেশ স্টেট বার কাউন্সিলের পরিচয়পত্র দেখিয়ে নিজেকে শুধুমাত্র আইনি পরামর্শদাতা হিসেবে দাবি করেন। তবে তদন্তে সংগৃহীত ডিজিটাল প্রমাণ তাঁর দাবির সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ বলে পুলিশ জানিয়েছে। এরপর ৮ সেপ্টেম্বর তাঁকে গ্রেফতার করা হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, ওয়ার্কইন্ডিয়া ও আপনা অ্যাপ-এর মতো নিয়োগ প্ল্যাটফর্ম এবং সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দিয়ে মহিলা টেলিকলার নিয়োগ করা হতো। তাঁদের অনেকেই প্রথমে মনে করতেন, তাঁরা একটি আসল বিবাহ-পরিচয় পরিষেবায় কাজ করছেন।
প্রতিষ্ঠানটিকে বৈধ বলে বিশ্বাস করাতে কর্মীদের সামনে এমএসএমই উদ্যম সার্টিফিকেট, উত্তরপ্রদেশ শ্রম দপ্তরের রেজিস্ট্রেশন, ফ্র্যাঞ্চাইজি চুক্তি এবং অমিতের বার কাউন্সিলের নথি দেখানো হতো বলে তদন্তকারীদের দাবি। পরে কিছু কর্মী প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পারলেও অতিরিক্ত আয়ের আশায় তাঁরা কাজ চালিয়ে যান বলে পুলিশের অভিযোগ।
প্রতারণার মাধ্যমে আদায় করা অর্থের ওপর জয়া শাক্যা ও অমিত কুমার টেলিকলারদের ১০ শতাংশ ইনসেনটিভ দিতেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। এর পাশাপাশি তাঁদের মাসিক বেতন ছিল প্রায় ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা।
প্রতারণাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে ভুয়ো ক্লায়েন্ট প্রোফাইল তৈরি করে তার স্ক্রিনশট ভুক্তভোগীদের পাঠানো হতো। কোনও ব্যক্তি ছবিতে দেখানো মহিলার সঙ্গে কথা বলতে চাইলে কল সেন্টারের অন্য কোনও মহিলা সেই সম্ভাব্য কনের পরিচয় নিয়ে ফোনে কথা বলতেন। কয়েক দিন ধরে কথোপকথনের মাধ্যমে ভুক্তভোগীর মনে প্রকৃত সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে বলে ধারণা তৈরি করা হতো।
এরপর নানা মিথ্যা অজুহাতে বিবাহের প্রস্তাব বাতিল করে দেওয়া হতো। কখনও ‘মাঙ্গলিক দোষ’, কখনও পরিবারের আপত্তি বা সংশ্লিষ্ট মহিলার অন্যত্র বাগদান হয়ে যাওয়ার কথা বলা হতো। ভুক্তভোগী আরও সম্বন্ধ চাইলে পোর্টালে থাকা অন্য পরিবারের প্রোফাইল দেখানো হতো।
পুলিশের অভিযোগ, ইন্টারনেট থেকে মহিলাদের ছবি সংগ্রহ, সম্ভাব্য কনে সেজে ফোনে কথোপকথন এবং পরিবারের সদস্য সেজে অন্য ব্যক্তিদের দিয়ে ফোন করানোর মাধ্যমে একটি বিশ্বাসযোগ্য বিবাহ-পরিচয় পরিষেবার মিথ্যা ছবি তৈরি করা হয়েছিল।
প্রতিটি মহিলা টেলিকলারের মাসে অন্তত ১৫ হাজার টাকা প্রতারণার মাধ্যমে আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল বলে পুলিশ জানিয়েছে। লক্ষ্য পূরণ না হলে বেতন কেটে নেওয়া এবং বারবার ব্যর্থ হলে চাকরি থেকে বরখাস্ত করার হুমকি দেওয়া হতো।
অভিযোগ এড়াতে চক্রটি আরও একটি কৌশল ব্যবহার করত বলে তদন্তকারীদের দাবি। কোনও ভুক্তভোগী সন্দেহজনক বা ক্ষুব্ধ হয়ে পুলিশের কাছে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলে টেলিকলাররা কখনও কখনও টাকা ফেরত দিয়ে বিষয়টি মিটিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতেন। কিন্তু এনসিআরপি-তে অভিযোগ দায়ের হলে প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকত। তখন অমিত কুমার তাঁর আইনজীবী পরিচয় ব্যবহার করে বিষয়টি সামলানোর চেষ্টা করতেন বলে পুলিশের অভিযোগ।
পুলিশের মতে, আগ্রার সিকান্দ্রা এলাকার বাসিন্দা অমিত কুমারই এই ভুয়ো বিবাহ-পরিচয় কল সেন্টারের প্রকৃত মালিক ও মূলচক্রী। অন্যদিকে পশ্চিম অর্জুন নগরের বাসিন্দা ৪৪ বছর বয়সি জয়া শাক্য ছিলেন প্রতিষ্ঠানের নথিভুক্ত একমাত্র মালিক ও অপারেশনাল ম্যানেজার। তিনি দৈনন্দিন টেলিকলিং কার্যক্রম এবং মহিলা কর্মীদের পরিচালনা করতেন।
এই ঘটনায় জ্যোতি কুমারী (২৭), করিশমা শর্মা (২৪), রশ্মি (২৪), অংশু কুমারী (৩২), মেঘনা পরাশর (২৩), পদ্মা (২৬) এবং আশিকা (২১)-কেও অভিযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করেছে পুলিশ। তাঁদের অধিকাংশই আগ্রার বাসিন্দা, আর অংশু কুমারীর আদি বাড়ি বিহারের ভাগলপুরে বলে জানানো হয়েছে।
























