নয়াদিল্লি, ৯ সেপ্টেম্বর (আইএএনএস): পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রতি আস্থা সংকটের মধ্যেই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলিকে প্রকাশ্যে সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের প্রশংসায় মুখর করার চেষ্টা চলছে বলে দাবি করেছেন ভারতীয় আধিকারিকরা। লস্কর-ই-তৈবার প্রধান ও প্রতিষ্ঠাতা হাফিজ সইদের ছেলে তালহা সইদের সাম্প্রতিক মন্তব্যকে এরই ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ভারত ও রাষ্ট্রপুঞ্জের সন্ত্রাসবাদী তালিকায় থাকা তালহা সইদ মুনিরকে ‘পবিত্র কোরআনের মুখস্থকারী’ হিসেবে উল্লেখ করে তাঁর প্রশংসা করেছেন। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেছেন, মুনির দেশে ধর্মবিশ্বাস, ধার্মিকতা এবং ‘জিহাদ’-এর পুনরুজ্জীবনে ভূমিকা রেখেছেন।
এক আধিকারিকের মতে, তালহা সইদের এই বক্তব্য পাকিস্তানি সামরিক নেতৃত্বের আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাঁর দাবি, ভারতের সঙ্গে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দীর্ঘদিনের সংঘাতকে সমর্থন ও যুক্তিসঙ্গত প্রতিপন্ন করার লক্ষ্যেই এই ধরনের বক্তব্য সামনে আনা হচ্ছে।
এক গোয়েন্দা ব্যুরোর আধিকারিক বলেন, মূল উদ্দেশ্য হল পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্ব এবং সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলির আদর্শগত অবস্থানকে আরও কাছাকাছি নিয়ে আসা।
আধিকারিকদের মতে, মুনির আন্তর্জাতিক স্তরে নিজেকে পাকিস্তানের ‘রক্ষাকর্তা’ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করলেও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলির অভ্যন্তরে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে তাঁর নেতৃত্ব নিয়ে সর্বসম্মতি নেই। ‘অপারেশন সিঁদুর’ মুনিরের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। এর পর তাঁর শক্তি ও নেতৃত্বের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
যদিও পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কঠোর হাতে সাধারণ মানুষের বিরোধিতা দমন করতে সক্ষম, সন্ত্রাসী সংগঠনগুলির নেতৃত্বের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে মুনির সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন বলে আধিকারিকদের দাবি।
‘অপারেশন সিঁদুর’-এ পাকিস্তানে সন্ত্রাসী সংগঠনগুলির একাধিক ঘাঁটি এবং পরিকাঠামো ধ্বংস হওয়ার পর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও আইএসআই তা পুনর্গঠনে অর্থ ঢেলেছে বলেও দাবি করা হয়েছে। তবে বিশেষ করে জইশ-ই-মহম্মদের মতো সংগঠনের মধ্যে পাকিস্তানি প্রশাসনের প্রতি আস্থা কমেছে। সেনাবাহিনী তাদের সুরক্ষা দিতে কতটা সক্ষম, তা নিয়েও সংগঠনের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে বলে আধিকারিকরা জানিয়েছেন।
এর পাশাপাশি সন্ত্রাসী সংগঠনগুলিতে নতুন নিয়োগও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে বলে দাবি করা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে শীর্ষ সন্ত্রাসী নেতাদের দিয়ে মুনির ও পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর প্রকাশ্য প্রশংসা করিয়ে পরিস্থিতি বদলানোর চেষ্টা করা হচ্ছে বলে মনে করছেন আধিকারিকরা।
তাঁদের মতে, এই কৌশলে পাকিস্তানি সামরিক নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় ভরসা লস্কর-ই-তৈবা। সংগঠনটি অতীতে পাকিস্তানি সামরিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেনি এবং দীর্ঘদিন ধরে সেনাবাহিনীর অন্যতম ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত প্রক্সি হিসেবে কাজ করে এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
তালহা সইদের প্রকাশ্য প্রশংসার পর আগামী দিনে আরও কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসী নেতাকে একই ধরনের বক্তব্য দিতে দেখা যেতে পারে বলেও আধিকারিকরা মনে করছেন।
এদিকে লস্কর-ই-তৈবার অভ্যন্তরে নেতৃত্ব সংকটও চলছে বলে দাবি করা হয়েছে। হাফিজ সইদের বয়স ও নেতৃত্বের ধরন নিয়ে সংগঠনের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। নতুন প্রজন্মের সদস্যদের একাংশ তাঁকে পুরনো ধ্যানধারণার বলে মনে করেন। এই পরিস্থিতিতে তালহা সইদকে সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে দেখা হলেও সংগঠনের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে বলে আধিকারিকদের দাবি।
মুনির ও পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর প্রকাশ্য প্রশংসা তালহা সইদের নেতৃত্বে আসার পথও সহজ করতে পারে। তবে তার জন্য পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং আইএসআইয়ের পূর্ণ সমর্থন প্রয়োজন বলে আধিকারিকরা জানিয়েছেন।
জইশ-ই-মহম্মদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের নেতৃত্ব পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। আধিকারিকদের মতে, পাকিস্তানি সামরিক নেতৃত্ব এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে জইশের নেতাদেরও সেনাবাহিনীর প্রশংসায় প্রকাশ্যে আসতে উৎসাহিত করতে পারে। এর মাধ্যমে সন্ত্রাসী সংগঠন এবং পাকিস্তানি সামরিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আদর্শগত সমন্বয় আরও জোরদার করার চেষ্টা হবে, বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সংঘাতের প্রশ্নে।
—আইএএনএস
























