নিজস্ব প্রতিনিধি, বিলোনিয়া, ৭ আগস্ট: “ম্যাম, সব গাছ কেটে ফেললে আমরা নিঃশ্বাস নেব কীভাবে?“একটি ছোট্ট প্রশ্ন। কিন্তু সেই প্রশ্নই যেন কাঁপিয়ে দিল বিলোনিয়ার যোগমায়া কালীবাড়ি সংলগ্ন জেবি (মডেল) স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকা, অভিভাবক এবং এলাকাবাসীকে। যে বয়সে শিশুরা বই, খাতা আর খেলাধুলা নিয়েই ব্যস্ত থাকে, সেই বয়সে তৃতীয় শ্রেণির এক ছাত্রীর মুখে পরিবেশ রক্ষার এমন প্রশ্ন অনেককেই ভাবিয়ে তুলেছে।
বইয়ের পাতায় আমরা পড়ি— “গাছ লাগান, প্রাণ বাঁচান।” অথচ বাস্তবে সেই স্কুল চত্বরে, যেখানে একসময় সবুজে ঘেরা মনোরম পরিবেশে পড়াশোনা করত শিশুরা, আজ সেখানে পড়ে রয়েছে কাটা গাছের গুঁড়ি আর শুকনো মাটি।
একসময় বিলোনিয়ার এই মডেল স্কুলের আঙিনা ছিল আগর, নিম, নাগেশ্বর, মেহগনি-সহ নানা প্রজাতির বড় বড় গাছে ভরপুর। গাছের ছায়া, পাখির ডাক, ফুলের সুবাস আর শিশুদের কোলাহলে মুখরিত থাকত পুরো স্কুল প্রাঙ্গণ। গরমের দিনেও গাছের ছায়া শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের স্বস্তি দিত। সেই সবুজ পরিবেশই এখন অতীত।
অভিযোগ উঠেছে, ঝুঁকিপূর্ণ গাছ অপসারণের কথা বলে স্কুল পরিচালন কমিটির চেয়ারম্যান তথা স্থানীয় কাউন্সিলর দীপা পালের উদ্যোগে স্কুল প্রাঙ্গণের প্রায় সব গাছই কেটে ফেলা হয়েছে। বনদপ্তরের কর্মীরা এসে একের পর এক গাছে কুঠার চালান বলে অভিযোগ। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সবুজে ঘেরা স্কুল পরিণত হয় প্রায় উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে। গাছ কাটার এই দৃশ্য দেখেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ে তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী পূরুবী দাস।
সে তার শিক্ষিকাকে প্রশ্ন করে বসে— “ম্যাম, সব গাছ কেটে ফেললে আমরা নিঃশ্বাস নেব কীভাবে?” একটি নিষ্পাপ কণ্ঠের এই প্রশ্নই যেন উপস্থিত সকলকে নীরব করে দেয়। যে প্রশ্নের উত্তর হয়তো বইয়ে লেখা নেই, কিন্তু বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে তা আরও গভীর হয়ে ওঠে।
এ প্রসঙ্গে স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা মৌসুমী ঘোষ পাল জানান, তিনি কখনও সমস্ত গাছ কাটার কথা বলেননি। তাঁর দাবি, স্কুলের নিরাপত্তার স্বার্থে মাত্র দুটি ঝুঁকিপূর্ণ গাছ অপসারণ এবং কয়েকটি গাছের ডাল ছেঁটে দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল।
শিক্ষিকার কথায়, “আমি সব গাছ কাটার কথা বলিনি। আমি শুধু দুটি বিপজ্জনক গাছ কাটার এবং কয়েকটি গাছের ডাল ছাঁটার কথা বলেছিলাম। কিন্তু এসে প্রায় সব গাছই কেটে ফেলা হয়েছে।”
অন্যদিকে বিষয়টি নিয়ে মহকুমা শাসকের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ভিন্ন বক্তব্য দেন। তাঁর দাবি, কাউন্সিলরের পক্ষ থেকে রিকুইজিশন লেটার পাওয়ার পর বনদপ্তরের সঙ্গে আলোচনা করেই গাছ কাটার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তিনি আরও জানান, সেখানে কোনো নতুন ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা নেই এবং কোন কোন গাছ কাটা হবে, তার চিহ্নিতকরণও সংশ্লিষ্ট কাউন্সিলরের পক্ষ থেকেই করা হয়েছিল।
এই ঘটনাকে ঘিরে এখন এলাকায় নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। পরিবেশপ্রেমীদের একাংশের বক্তব্য, ঝুঁকিপূর্ণ গাছ অপসারণের প্রয়োজন থাকলেও নির্বিচারে সবুজ ধ্বংস কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়, শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
দেশজুড়ে যখন “এক পেড় মা কে নাম” কর্মসূচির মাধ্যমে প্রত্যেককে অন্তত একটি গাছ লাগানোর আহ্বান জানানো হচ্ছে, তখন বিলোনিয়ার একটি স্কুলে একসঙ্গে এতগুলো গাছ কেটে ফেলার ঘটনায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে পরিবেশ সংরক্ষণ নিয়ে প্রশাসনের অবস্থান নিয়ে।
এলাকাবাসীর প্রশ্ন, উন্নয়নের নামে বা নিরাপত্তার অজুহাতে যদি এভাবেই সবুজ হারিয়ে যায়, তবে আগামী প্রজন্মকে আমরা কী উপহার দেব? অক্সিজেনের অভাব, নাকি কংক্রিটের প্রাচীর? হয়তো তৃতীয় শ্রেণির ছোট্ট পূরুবী দাস বইয়ের বাইরে দাঁড়িয়েই পরিবেশ রক্ষার সবচেয়ে বড় শিক্ষা দিয়ে দিল। গাছ কাটা শেষ হয়েছে, কিন্তু তার সেই নিষ্পাপ প্রশ্ন বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে— “সব গাছ কেটে ফেললে আমরা নিঃশ্বাস নেব কীভাবে?”



















