আগরতলা, ২২ সেপ্টেম্বর: ত্রিপুরায় পথ দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমশ কমছে। আজ আগরতলার স্টেট গেস্ট হাউসে আয়োজিত সড়ক নিরাপত্তা সচেতনতা ও সংবেদনশীলতা কর্মসূচিতে পরিবহণমন্ত্রী সুশান্ত চৌধুরী জানান, ২০২৩ সালে রাজ্যে ৫৭৭টি পথ দুর্ঘটনায় ২৬১ জনের মৃত্যু হয়েছিল। ২০২৪ সালে ৫৭৮টি দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় ২২৬ জনের। ২০২৫ সালে দুর্ঘটনার সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৫২৭-এ এবং মৃতের সংখ্যা নেমে আসে ১৫৭-তে। সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত রাজ্যে পথ দুর্ঘটনায় ১৩৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।
মন্ত্রী জানান, পরিবহণ ও পুলিশ দপ্তরের সমন্বিত উদ্যোগ, নিয়মিত অভিযান এবং সড়ক নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিভিন্ন ব্যবস্থা কার্যকরভাবে পর্যবেক্ষণের ফলেই দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা কমেছে। তবে শুধু সড়ক নিরাপত্তা বিধি মেনে চলাই নয়, দুর্ঘটনায় আহত ও ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পের সুবিধা যাতে দ্রুত পৌঁছে দেওয়া যায়, সেদিকেও এখন গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এদিন ‘রাহাগির’, ‘পিএম রাহাত’ এবং হিট অ্যান্ড রান সংক্রান্ত ক্ষতিপূরণ প্রকল্পের বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন পরিবহণমন্ত্রী। তিনি নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনিক আধিকারিকদের কাছে আবেদন জানান, এই প্রকল্পগুলির সুবিধা সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সচেতন করে তুলতে হবে।
মন্ত্রী জানান, ‘রাহাগির’ প্রকল্পটি আগে ‘গুড সামারিটান’ প্রকল্প নামে পরিচিত ছিল। দুর্ঘটনার পর ‘গোল্ডেন আওয়ার’-এর মধ্যে আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়া কোনও ব্যক্তি এই প্রকল্পের আওতায় ২৫ হাজার টাকা পুরস্কার পেতে পারেন। পাশাপাশি প্রযোজ্য বিধি অনুযায়ী তাঁকে অপ্রয়োজনীয় পুলিশি হয়রানি থেকে সুরক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে। ২০২৫ সালে রাজ্যে ১১ জন এবং ২০২৬ সালে এখনও পর্যন্ত ৭ জনকে এই প্রকল্পের আওতায় স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
তবে দুর্ঘটনার সংখ্যার তুলনায় এই প্রকল্পে সুবিধাভোগীর সংখ্যা অত্যন্ত কম বলেও উল্লেখ করেন মন্ত্রী। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শুধু ২০২৬ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসেই রাজ্যে ৪১৩টি পথ দুর্ঘটনা ঘটেছে। ফলে এই ধরনের প্রকল্প সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে আরও ব্যাপক সচেতনতা গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি জানান।
‘পিএম রাহাত’ প্রকল্পের প্রসঙ্গে সুশান্ত চৌধুরী জানান, যোগ্য পথ দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিরা নির্দিষ্ট হাসপাতালে এই প্রকল্পের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ১.৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত নগদবিহীন চিকিৎসার সুবিধা পেতে পারেন। ত্রিপুরায় এখনও পর্যন্ত ৩৩৬ জন এই প্রকল্পের সুবিধা পেয়েছেন এবং প্রায় ৬.১৬ লক্ষ টাকা সহায়তা দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে, হিট অ্যান্ড রান দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী মৃতের পরিবারকে ২ লক্ষ টাকা এবং আহতদের ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা রয়েছে বলেও জানান পরিবহণমন্ত্রী।
তিনি পঞ্চায়েত সমিতির চেয়ারম্যান, জেলা পরিষদের সদস্য, নগর স্থানীয় সংস্থার চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যানদের নিজ নিজ এলাকায় এই প্রকল্পগুলির বিষয়ে সাধারণ মানুষকে অবহিত করার আহ্বান জানান। তাঁর কথায়, “আমরা নিজেরাই যদি এই প্রকল্পগুলি সম্পর্কে সম্পূর্ণভাবে অবহিত না থাকি, তাহলে অন্যদের সঠিকভাবে পথ দেখাতে পারব না।”
প্রকল্পগুলির সুবিধা পাওয়ার পদ্ধতি সম্পর্কে আয়োজিত কারিগরি প্রশিক্ষণ ও সচেতনতামূলক অধিবেশনগুলিতে জনপ্রতিনিধি ও আধিকারিকদের সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
মন্ত্রী বলেন, সড়ক নিরাপত্তা কর্মসূচি যেন শুধুমাত্র বছরে একবার পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। জনসম্পৃক্ততা বা ‘জন ভাগীদারি’র মাধ্যমে এটিকে ধারাবাহিক সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করতে হবে।
পথ দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা কমানোর ক্ষেত্রে পুলিশ ও পরিবহণ দপ্তরের ভূমিকারও প্রশংসা করেন সুশান্ত চৌধুরী। এ প্রসঙ্গে তিনি ত্রিপুরার প্রাক্তন পুলিশ মহাপরিচালক অনুরাগ ধানকারের কথাও স্মরণ করেন। মন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, অনুরাগ ধানকার নিয়মিত সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের বৈঠকে অংশ নিতেন এবং সড়ক নিরাপত্তা বৃদ্ধির বিভিন্ন উদ্যোগকে উৎসাহিত করতেন।
আগামী দিনে পথ দুর্ঘটনা আরও কমানো এবং দুর্ঘটনাগ্রস্তদের দ্রুত সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে পরিবহণ দপ্তর, পুলিশ, স্বাস্থ্য দপ্তর, জেলা প্রশাসন ও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের প্রয়োজন রয়েছে বলে জানান পরিবহণমন্ত্রী।



















