নিজস্ব প্রতিনিধি, আগরতলা, ২১ সেপ্টেম্বর: চাকরি ও শিক্ষাক্ষেত্রে সংরক্ষণ ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে যখন রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে যুবসমাজের মধ্যে নানা প্রশ্ন ও দাবি উঠছে, ঠিক সেই সময় সরকারি প্রতিষ্ঠানে এএনএম ও জিএনএম কোর্সে ভর্তির কাউন্সেলিংকে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। মেধাতালিকায় যোগ্য প্রার্থী হিসেবে স্থান পাওয়ার পরও অসংরক্ষিত বা ‘ইউআর’ (আন – রিজার্ভড) বিভাগের আসনে সংরক্ষিত শ্রেণির প্রার্থীদের সুযোগ দেওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে সোমবার তীব্র অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। মেধাতালিকায় অবস্থান থাকা সত্ত্বেও পছন্দের সরকারি প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ না পাওয়ায় বেশ কয়েকজন মেধাবী প্রার্থী এবং তাঁদের অভিভাবকদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়।
জানা যায়, ত্রিপুরা সরকারের ডাইরেক্টর অফ মেডিকেল কাউন্সিলের পক্ষ থেকে ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে এএনএম এবং জিএনএম কোর্সে সরকারি প্রতিষ্ঠানে ভর্তির জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছিল। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী আগ্রহী ছাত্রীরা আবেদনপত্র জমা দেন। পরবর্তী সময়ে আবেদনকারীদের ইন্টারভিউ অনুষ্ঠিত হয় এবং এরপর প্রকাশ করা হয় মেধাতালিকা।
অভিযোগকারী ছাত্রীদের বক্তব্য অনুযায়ী, জিএনএম কোর্সে ভর্তির বিজ্ঞপ্তিতে ‘ইউআর’ অর্থাৎ অসংরক্ষিত বিভাগের জন্য মোট ২১টি আসন নির্ধারিত থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। একই সঙ্গে এসটি বিভাগের জন্য ১৩টি এবং এসসি বিভাগের জন্য ৬টি আসন সংরক্ষিত থাকার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু আবেদন পত্রে যারা ইউআর হিসেবে আবেদন করেছেন, মেধাতালিকায় যারা স্থানও পেয়েছেন তারাই আসন থেকে বঞ্চিত হলেন।
কিন্তু সোমবার জিএনএম কোর্সের কাউন্সেলিংয়ে অংশ নিতে গিয়ে আবেদনকারীদের অভিযোগ, মেধাতালিকা অনুযায়ী ‘ইউআর’ বিভাগের ২১ জন ছাত্রীর সুযোগ পাওয়ার কথা থাকলেও সেই আসনগুলির একটি বড় অংশে এসসি ও এসটি বিভাগের প্রার্থীদের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি সামনে আসতেই ‘ইউআর’ বিভাগের ছাত্রী ও তাঁদের অভিভাবকদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
অভিযোগকারীদের দাবি, বিজ্ঞপ্তিতে যখন ইউআর বিভাগের জন্য নির্দিষ্ট সংখ্যক আসন বরাদ্দের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল, তখন সেই আসনগুলিতে ইউআর প্রার্থীদের পরিবর্তে এসসি ও এসটি বিভাগের প্রার্থীদের কীভাবে সুযোগ দেওয়া হল, সেটিই তাঁদের মূল প্রশ্ন। তাঁদের আরও অভিযোগ, মোট ৪০টি জিএনএম আসনের মধ্যে মাত্র ৮টি আসন ইউআর বিভাগের প্রার্থীরা পেয়েছেন। বাকি ইউআর আসনগুলিও এসসি ও এসটি বিভাগের প্রার্থীদের দেওয়া হয়েছে বলে তাঁদের অভিযোগ।
এমন পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট ছাত্রীরা সংরক্ষণ নীতি এবং আসন বণ্টনের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের বক্তব্য, তাঁরা মেধাতালিকায় যোগ্য প্রার্থী হিসেবে স্থান পাওয়ার পরও নির্ধারিত ইউআর আসনে সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এর ফলে তাঁদের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন তাঁরা।
অভিযোগকারী ছাত্রীদের আরও প্রশ্ন, যদি এসসি ও এসটি বিভাগের প্রার্থীরা ইউআর বিভাগের আসনে সুযোগ পান, তাহলে তাঁরা কি একই সঙ্গে এসসি-এসটি সংরক্ষিত আসনের সুবিধা থেকে সম্পূর্ণভাবে বঞ্চিত হবেন? সংরক্ষিত বিভাগের প্রার্থীরা ইউআর আসনে স্থান পাওয়ার পর সংরক্ষিত শ্রেণির জন্য নির্ধারিত আসন ও অন্যান্য সুবিধার ক্ষেত্রে কী নিয়ম কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়েও তাঁরা স্পষ্টীকরণ দাবি করেছেন।
বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছেও প্রশ্ন তোলেন ছাত্রীরা ও তাঁদের অভিভাবকরা। তাঁদের দাবি, গোটা কাউন্সেলিং প্রক্রিয়া স্বচ্ছতার সঙ্গে সম্পন্ন করা হোক এবং কোন নিয়মের ভিত্তিতে কোন প্রার্থীকে কোন আসন দেওয়া হয়েছে, তা প্রকাশ্যে স্পষ্ট করা হোক।
তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কাউন্সেলিংয়ের ক্ষেত্রে নির্ধারিত সমস্ত গাইডলাইন ও নিয়ম মেনেই প্রার্থীদের আসন বরাদ্দ করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, শুধু সংরক্ষণ নীতিই নয়, আসন সংখ্যা, সংরক্ষণ ব্যবস্থা, মেধাক্রম এবং প্রার্থীদের পছন্দের ভিত্তিতেই কাউন্সেলিং প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। অর্থাৎ, কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী আসন বণ্টনে নির্ধারিত নিয়মের কোনও ব্যত্যয় ঘটেনি।
অন্যদিকে, কাউন্সেলিং প্রক্রিয়াকে ঘিরে তৈরি হওয়া অসন্তোষের পর প্রার্থীদের একাংশ পুরো বিষয়টি আরও স্পষ্ট করার দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, মেধাতালিকায় প্রত্যেক প্রার্থীর অবস্থান, প্রাপ্ত নম্বর, সংরক্ষণের শ্রেণি এবং পছন্দের প্রতিষ্ঠান—এই সমস্ত বিষয় বিবেচনা করে ঠিক কীভাবে আসন বরাদ্দ করা হয়েছে, তা পরিষ্কারভাবে জানানো হলে বিভ্রান্তি অনেকটাই দূর হবে।
সংশ্লিষ্ট ছাত্রীদের অভিযোগ, ভর্তির বিজ্ঞপ্তিতে ইউআর অর্থাৎ অসংরক্ষিত বিভাগের জন্য মোট ২১টি আসন বরাদ্দ থাকার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল। পাশাপাশি এসসি ও এসটি বিভাগের জন্য পৃথক সংরক্ষিত আসনও নির্ধারিত ছিল। তাহলে অসংরক্ষিত বিভাগের জন্য নির্ধারিত আসনে কীভাবে এসসি-এসটি বিভাগের প্রার্থীদের স্থান দেওয়া হল—এই প্রশ্নেরই উত্তর চাইছেন তাঁরা।
তাঁদের আরও বক্তব্য, গোটা রাজ্যে শিক্ষার অগ্রগতি এবং স্বচ্ছ ও মেধাভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থার কথা বলা হলেও ভর্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রক্রিয়াকে ঘিরে এমন অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। এই অভিযোগের ফলে রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও আসন বণ্টন প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠছে বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগী ছাত্রী ও তাঁদের অভিভাবকরা।
তবে অভিযোগের পাশাপাশি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে নিয়ম মেনে কাউন্সেলিং সম্পন্ন করার দাবি করা হয়েছে। ফলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখিত সংরক্ষণ ব্যবস্থা, মেধাক্রম, আসন বণ্টনের নিয়ম এবং বাস্তবে কোন ভিত্তিতে প্রার্থীদের আসন দেওয়া হয়েছে—এই বিষয়গুলির পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কাউন্সেলিংকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া এই পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কীভাবে বিষয়টির স্পষ্টীকরণ করেন এবং অভিযোগকারী ছাত্রী ও তাঁদের অভিভাবকদের বিভ্রান্তি কীভাবে দূর করা হয়, সেদিকেই এখন নজর রয়েছে।
মেধাতালিকায় যোগ্যতা অর্জন করেও যদি নির্ধারিত আসনে ভর্তির সুযোগ না মেলে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—মেধার মূল্যায়ন ঠিক কোথায়? সংরক্ষণ নীতির উদ্দেশ্য নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে, কিন্তু সেই নীতির প্রয়োগ যদি বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখিত আসন কাঠামো নিয়েই বিভ্রান্তি তৈরি করে, তাহলে তার দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। ইউআর আসন, সংরক্ষিত আসন, মেধাক্রম এবং আসন বণ্টনের নিয়ম—প্রতিটি বিষয়ই যদি স্বচ্ছ থাকে, তাহলে কোনও প্রার্থীর মনে বঞ্চনার প্রশ্ন ওঠার কথা নয়।
আর যদি নিয়ম মেনেই সবকিছু হয়ে থাকে, তবে সেই নিয়ম ও হিসাব জনসমক্ষে প্রকাশ করতে আপত্তি কোথায়? কারণ ভবিষ্যতের নার্সিং প্রার্থীদের কাছে এটি শুধু একটি ভর্তি প্রক্রিয়া নয়, তাঁদের শিক্ষা ও কর্মজীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি সুযোগ। তাই অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তির পাশাপাশি স্পষ্ট করতে হবে—মেধাতালিকায় স্থান পাওয়া প্রার্থীরা ঠিক কোন নিয়মে আসন থেকে বঞ্চিত হলেন এবং সংরক্ষিত শ্রেণির প্রার্থীরা কোন বিধানের ভিত্তিতে ইউআর আসনে সুযোগ পেলেন। নইলে ‘মেধা না সংরক্ষণ—কোনটির ভিত্তিতে আসন?’ এই প্রশ্নই আরও জোরালো হয়ে উঠবে।


















