নয়াদিল্লি, ২২ সেপ্টেম্বর (আইএএনএস): মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাংলাদেশের সঙ্গে আমেরিকার স্বাক্ষরিত ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোকাল ট্রেড’ নিয়ে সাত মাসেরও বেশি সময় পরেও প্রশ্ন উঠছে। চুক্তির শর্ত ও স্বাক্ষরের সময় নিয়ে বিতর্কের পাশাপাশি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি (বিএনপি) সরকারকে চুক্তিটি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের একাংশ।
বাংলাদেশের সংবাদপত্র ‘দ্য ডেইলি স্টার’-এ মঙ্গলবার প্রকাশিত একটি নিবন্ধে দাবি করা হয়েছে, এআরটি স্বাক্ষরকারী ১০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের চুক্তিটিকে সবচেয়ে একতরফা বলে মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। তবে নিবন্ধটিতে একইসঙ্গে বলা হয়েছে, অন্য এআরটি-গুলির সঙ্গে তুলনা করে এমন কোনও পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ প্রকাশিত হয়নি। ফলে এই মূল্যায়নকে নিশ্চিত র্যাঙ্কিং হিসেবে দেখা যায় না।
নিবন্ধে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলির মধ্যে বাংলাদেশ কেন এত দ্রুত চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল। বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে অন্তর্বর্তী সরকার চুক্তিতে সই করায় এর সময় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তখন নির্বাচিত সংসদে চুক্তিটি নিয়ে আলোচনা বা অনুমোদনের সুযোগ ছিল না এবং নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও সংসদে এর বিস্তারিত পর্যালোচনা হয়নি বলে নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর আগে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানাও চুক্তিটির সংসদীয় পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরেই এই ধরনের চুক্তি স্বাক্ষর করা উচিত ছিল।
এপ্রিলের মাঝামাঝি ঢাকায় ছাত্র সংগঠনসহ বিভিন্ন সংগঠন চুক্তিটির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখায়। বিক্ষোভকারীরা একে ‘পরাধীনতার চুক্তি’ বলে অভিহিত করে। তাঁদের অভিযোগ, এই চুক্তি শুল্কনীতি এবং শ্রম সংক্রান্ত বিধি নির্ধারণে বাংলাদেশের স্বায়ত্তশাসনকে সীমিত করতে পারে। অন্যদিকে, চুক্তির শর্ত পুনরায় আলোচনার উদ্যোগ নিলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে বলে সরকারের মধ্যে আশঙ্কা রয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
‘দ্য ডেইলি স্টার’-এর নিবন্ধে আরও বলা হয়েছে, চুক্তিতে বাধ্যতামূলক ‘শ্যাল’ শব্দটি ১৭৯ বার ব্যবহৃত হয়েছে এবং এর অধিকাংশই বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে যুক্ত। তবে শুধু শব্দের সংখ্যা দিয়ে চুক্তির প্রকৃত দায়বদ্ধতা নির্ধারণ করা যায় না বলেও নিবন্ধে স্বীকার করা হয়েছে।
চুক্তির পর বাংলাদেশ বিপুল পরিমাণ মার্কিন পণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে বোয়িং বিমান কেনার পরিকল্পনা রয়েছে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশের পরিকল্পিত বোয়িং বিমান কেনার সংখ্যা ১৪ থেকে বাড়িয়ে ২৫ করা হয়েছে বলে আগে খবর প্রকাশিত হলেও পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশি কর্মকর্তারা জানান, বিমান সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ১৪টি বিমানের অর্ডারের বাইরে আলাদা কোনও চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি।
তবে মার্কিন দূত সার্জিও গোর আগস্টের শেষ দিকে জানান, বাংলাদেশ আরও কয়েক বিলিয়ন ডলারের বোয়িং বিমান কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং প্রাথমিক অর্ডারের তুলনায় তা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে। তিনি নির্দিষ্ট সংখ্যা জানাননি।
এছাড়া বাংলাদেশ মন্ত্রিসভা গত মাসে মার্কিন সংস্থা গানভোর ইউএসএ-র সঙ্গে ১২ বছরের একটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) চুক্তিতে অনুমোদন দিয়েছে। চুক্তির আওতায় ২০৩৮ সাল পর্যন্ত ১১৭টি এলএনজি কার্গো বা প্রায় ৭৫ লক্ষ টন গ্যাস সরবরাহের কথা রয়েছে।
নিবন্ধে দাবি করা হয়েছে, এই চুক্তি প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়াই একটি বেসরকারি বাণিজ্য সংস্থার সঙ্গে অস্বাভাবিক রাষ্ট্র-থেকে-রাষ্ট্র মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতির মাধ্যমে করা হয়েছে। তবে আঞ্চলিক উত্তেজনার কারণে কাতারের এলএনজি সরবরাহে সম্ভাব্য সমস্যার বিরুদ্ধে ঝুঁকি কমাতেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে বাংলাদেশ সরকার ব্যাখ্যা দিয়েছে।
অন্যদিকে, চুক্তির ‘পারস্পরিক’ সুবিধা নিয়ে প্রশ্ন তুলে নিবন্ধে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের বৃহত্তম রফতানি খাত তৈরি পোশাক শিল্প বর্তমানে বিভিন্ন শুল্ক মিলিয়ে ২০ শতাংশের মাঝামাঝি কার্যকর শুল্কের মুখোমুখি হচ্ছে। বিপরীতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মার্কিন তুলা ব্যবহারের সঙ্গে যুক্ত শূন্য-শুল্ক সুবিধার একটি ‘মেকানিজম’-এর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তবে এর কোনও নিশ্চিত গ্যারান্টি নেই বলে নিবন্ধে দাবি করা হয়েছে।
নিবন্ধটির বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ বাস্তবে বহু বিলিয়ন ডলারের ক্রয়-প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করছে, যেখানে মার্কিন পক্ষের শূন্য-শুল্ক সুবিধার প্রতিশ্রুতি চুক্তি স্বাক্ষরের ছয় মাসেরও বেশি সময় পরেও স্পষ্ট ও কার্যকর রূপ পায়নি। চুক্তির আইনি ও রাজনৈতিক দিক নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
























