পুরী, ১৬ জুলাই (আইএএনএস): বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ও ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় উৎসব শ্রীজগন্নাথ রথযাত্রা বৃহস্পতিবার ওড়িশার পুরীতে শুরু হয়েছে। ভগবান জগন্নাথ, বড়ভাই বলভদ্র এবং বোন সুভদ্রার বার্ষিক রথযাত্রা উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লক্ষ লক্ষ ভক্ত পুরীতে সমবেত হয়েছেন। নিরাপত্তা, যান চলাচল ও ভিড় নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছে বিস্তৃত ব্যবস্থা।
হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, বছরের এই একদিনই শ্রীমন্দিরের গর্ভগৃহ থেকে বেরিয়ে এসে ভগবান জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রা সকল ভক্তকে দর্শন দেন। তিন দেবদেবীকে সুসজ্জিত তিনটি বিশাল কাঠের রথে আরোহন করিয়ে হাজার হাজার ভক্ত রশি টেনে শ্রীমন্দির থেকে গুন্ডিচা মন্দিরে নিয়ে যান। বিশ্বাস করা হয়, সেখানে তাঁরা তাঁদের মাসির বাড়িতে গমন করেন। এই যাত্রা ভগবানের সকলের কাছে সমানভাবে পৌঁছে যাওয়া, করুণা ও মানবতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে পুরীতে ব্যাপক নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে। ওড়িশা পুলিশ জানিয়েছে, ১৩ হাজারেরও বেশি পুলিশকর্মী এবং কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর (সিএপিএফ) সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। নিরাপত্তা তদারকিতে রয়েছেন ১৯ জন সিনিয়র আইপিএস অফিসার। উপকূলীয় পথে কোনও বেআইনি কার্যকলাপ রুখতে সতর্ক রয়েছে ভারতীয় কোস্ট গার্ড ও ভারতীয় নৌবাহিনী।
ভক্তদের সুবিধার্থে শহরজুড়ে ৫৯৫টি স্থায়ী এবং ১,০৫০টি অস্থায়ী নির্দেশিকা বোর্ড বসানো হয়েছে। এছাড়া ৪৭৩টি সিসিটিভি ক্যামেরা, ৬৫টি বড় এলইডি স্ক্রিন এবং ১৬টি স্থায়ী মোবাইল টাওয়ারের পাশাপাশি একাধিক অস্থায়ী টাওয়ার স্থাপন করা হয়েছে। ওড়িয়া, হিন্দি ও ইংরেজিতে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পৌঁছে দিতে বাল্ক মেসেজিং পরিষেবাও চালু করা হয়েছে।
রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে ভক্তদের যাতায়াত সহজ করতে ভারতীয় রেলওয়ে জগদলপুর–পুরী এবং রায়গড়া–পুরী রুটে বিশেষ ট্রেন চালানোর ঘোষণা করেছে।
এদিকে, প্রবল বৃষ্টির মধ্যেও রথযাত্রার আগে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা করে এক অনন্য অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন শিল্পীরা। এক নৃত্যশিল্পী আইএএনএস-কে বলেন, “ভগবান জগন্নাথ আবেগের দেবতা। বৃষ্টির মধ্যেও আমরা তাঁর জন্য নাচতে এসেছি। যখন মহাপ্রভু বেরিয়ে আসেন, তখন মনে হয় তিনি নিজেই নৃত্য করছেন।”
অন্য এক শিল্পীর কথায়, “এবার এখানে আসাটা অলৌকিক মনে হয়েছে। প্রবল বৃষ্টি যেন ভগবান ইন্দ্রের আশীর্বাদ। মনে হচ্ছে, মহাপ্রভুর আগমনের আগে প্রকৃতি নিজেই পৃথিবীকে পবিত্র করে তুলছে।”
এক মহিলা নৃত্যশিল্পী বলেন, বছরে একবার ভগবান জগন্নাথ নিজে ভক্তদের কাছে আসেন—তাঁর সামনে নৃত্য পরিবেশন করতে পারা তাঁদের কাছে পরম সৌভাগ্যের বিষয়। আরেক শিল্পী জানান, প্রবল বৃষ্টির মধ্যেও তাঁরা নাচ থামাননি, কারণ মহাপ্রভু নৃত্য ভালোবাসেন এবং তাঁদের এই পরিবেশনা কেবল তাঁরই উদ্দেশে নিবেদিত।
‘লিঙ্গরাজ কলা নিকেতন’-এর এক নৃত্যশিক্ষক জানান, প্রতি বছরই তাঁরা মহাপ্রভুর সেবায় নৃত্য পরিবেশন করেন। প্রবল বর্ষার মধ্যে এই পরিবেশনা এক ভিন্নধর্মী এবং স্মরণীয় অভিজ্ঞতা।
অন্যদিকে, জগন্নাথ মন্দিরের ছুনারা সেবায়েত শরৎ মহান্তি আইএএনএস-কে জানান, রথযাত্রার আগে মন্দিরের ভিতরে প্রয়োজনীয় সমস্ত আচার-অনুষ্ঠান দ্রুত সম্পন্ন হচ্ছে। তাঁর কথায়, “মহাপ্রভুর ইচ্ছাতেই এবার সব আচার দ্রুত শেষ হয়েছে। তিনি যেন তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এসে লক্ষ লক্ষ ভক্তকে দর্শন দিতে চান।”



















