আগরতলা, ৯ জুলাই: টানা ভারী বর্ষণের জেরে ত্রিপুরার একাধিক জেলায় বন্যা, ভূমিধস এবং ঝড়ে জনজীবন ব্যাপকভাবে বিপর্যস্ত হয়েছে। রাজ্য জরুরি পরিচালন কেন্দ্র-এর প্রকাশিত সর্বশেষ দৈনিক পরিস্থিতি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক চিত্র। প্রবল বৃষ্টির কারণে বিভিন্ন জেলায় সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হয়েছে, শতাধিক বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং হাজার হাজার মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিয়ে যেতে হয়েছে।
যদিও উত্তর ত্রিপুরা, উনকোটি, সিপাহিজলা, পশ্চিম ত্রিপুরা এবং দক্ষিণ ত্রিপুরা জেলায় বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর মেলেনি, তবে ধলাই, খোয়াই এবং গোমতী জেলায় পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে ধলাই জেলায় একাধিক স্থানে ভূমিধসের ঘটনা এবং খোয়াই জেলায় গাছ উপড়ে পড়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।
ধলাই জেলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ধলাই জেলার আমবাসা ও লংতরাইভ্যালি মহকুমায় ভারী বৃষ্টির ফলে একাধিক স্থানে ভূমিধসের ঘটনা ঘটে। আসাম-আগরতলা জাতীয় সড়কের উৎপলনগর মোড় এলাকায় ভূমিধসের কারণে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরে এনএইচআইডিসিএল-এর উদ্যোগে রাস্তা পরিষ্কার করে যান চলাচল স্বাভাবিক করা হয়। একইভাবে হারিনছড়া-গঙ্গানগর সড়কেও ভূমিধসের জেরে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লেও পিডব্লিউডি, বনদপ্তর এবং সিভিল ডিফেন্সের যৌথ প্রচেষ্টায় রাস্তা পরিষ্কার করা হয়।
লংতরাইভ্যালি মহকুমার চৈলেংটা-চাওমনু সড়ক, মনু-এস কে পাড়া সড়ক, এনএইচ-০৮-এর এস কে পাড়া-বিধ্যামণিক পাড়া এলাকা এবং সিএমএন-থালছড়া সড়কেও ভূমিধসের কারণে যান চলাচল ব্যাহত হয়। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলির তৎপরতায় অধিকাংশ সড়ক ইতিমধ্যেই চলাচলের উপযোগী করা হয়েছে।
ক্ষয়ক্ষতির নিরিখে আমবাসা মহকুমায় ১ বাড়ি সম্পূর্ণ, ৩টি বাড়ি মারাত্মকভাবে এবং ৭টি বাড়ি আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে, লংতরাই ভ্যালিতে ৪৩টি বাড়ি সম্পূর্ণ, ৬৭টি বাড়ি মারাত্মকভাবে এবং ১৫৭টি বাড়ি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে আর্থিক সহায়তা প্রদানের প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই শুরু করেছে প্রশাসন।
এছাড়া গণ্ডাতুইসা মহকুমায় ৭টি বাড়ি মারাত্মকভাবে এবং ১৫টি বাড়ি আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ সমীক্ষা চালিয়ে আর্থিক সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ধলাইয়ে ১৩টি ত্রাণ শিবির খোলা হয়েছে আশ্রয়ে ১,১৮৭ মানুষ। বন্যা ও ভূমিধস পরিস্থিতি মোকাবিলায় ধলাই জেলায় মোট ১৩টি ত্রাণ শিবির খোলা হয়েছে। ধন্যারাম কে/পাড়া উচ্চ বিদ্যালয়, লারাই কে/পাড়া এসবি স্কুল, জামিরছড়া ভিসি অফিস, মনু ফরেস্ট রেস্ট হাউস, বিজয়গরী দেবনপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়, মাধবচন্দ্র ক্লাস-১২ স্কুল, মাধব মাস্টার এডব্লিউসি, কল্যাণচক্মা পাড়া এসবি স্কুল, নীলকান্ত পাড়া জেবি স্কুল, ধুমাছড়া ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল, মনু টাউন হল, মনু মোটর স্ট্যান্ড এবং গজিনামা এসএস বিল্ডিংয়ে মোট ১,১৮৭ জন আশ্রয় নিয়েছেন।
তেলিয়ামুড়ায় গাছ উপড়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, খোলা হয়েছে ৯টি ত্রাণ শিবির
খোয়াই জেলার তেলিয়ামুড়া মহকুমায় প্রবল বর্ষণের জেরে একাধিক স্থানে বড় গাছ উপড়ে পড়ে সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হয়। হালুদিয়া ভিসির ভাস্করছড়া বাজার সংলগ্ন সড়ক, মুঙ্গিয়াকামি ব্লকের ৪৭ মাইল, ৪৬ মাইল এবং ৩৬ মাইল এলাকায় রাস্তার উপর গাছ পড়ে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরে বনদপ্তর, সিভিল ডিফেন্স, এডিএম এবং ৩৭ ব্যাটালিয়ন টিএসআর-এর যৌথ উদ্যোগে দ্রুত রাস্তা পরিষ্কার করা হয়।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় তেলিয়ামুড়ায় মোট ৯টি ত্রাণ শিবির খোলা হয়েছে। ভারতনগর এডব্লিউসি, সরদাময়ী বিদ্যাপীঠ, শিশু মালঞ্চ এসবি স্কুল, লোকনাথ, ক্ষীরোদ নায়কপাড়া জেবি স্কুল, তুইকারমা পাড়া এডব্লিউসি, নেতাজিনগর এডব্লিউসি, ত্রিশাবাড়ি জেবি স্কুল এবং ওল্ড ব্রিফ হাউস (ডিসিএম সংলগ্ন)-এ বর্তমানে মোট ১,৪০২ জন আশ্রয় নিয়েছেন।
গোমতী জেলার করবুক মহকুমায় যতনবাড়ি-রাইশ্যাবাড়ি সড়কের উপর বড় গাছ উপড়ে পড়ায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরে পিডব্লিউডি দ্রুত রাস্তা পরিষ্কার করে যোগাযোগ ব্যবস্থা স্বাভাবিক করে।
রাজ্য জরুরি পরিচালন কেন্দ্রের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, টানা বর্ষণে রাজ্যজুড়ে মোট ৩০০টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৪৪টি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত, ৭৭টি মারাত্মকভাবে এবং ১৭৯টি আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বর্তমানে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে মোট ২২টি ত্রাণ শিবির চালু রয়েছে। এসব শিবিরে ৪৩৪টি পরিবারের মোট ২,৫৮৯ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। এখনও পর্যন্ত এই দুর্যোগে কোনো প্রাণহানি বা আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। বিদ্যুতের খুঁটি বা বিদ্যুৎ পরিকাঠামোরও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর নেই।
রাজ্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলিতে সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানো হচ্ছে। রাস্তা পরিষ্কার, উদ্ধারকাজ, ত্রাণ বিতরণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে আর্থিক সহায়তা প্রদানের কাজ জোরকদমে চলছে। পাশাপাশি আগামী কয়েকদিন ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকায় নদী তীরবর্তী ও পাহাড়ি এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার এবং প্রশাসনের নির্দেশিকা মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে।



















