কলকাতা, ২২ জুন : পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট সোমবার বিধানসভায় পেশ করবেন রাজ্যের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাসগুপ্ত। সাংবাদিক থেকে রাজনীতিক হয়ে ওঠা স্বপন দাশগুপ্তের এই প্রথম বাজেটকে ঘিরে রাজ্যের অর্থনীতি, ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং শিল্পায়নের ভবিষ্যৎ নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
সোমবার দুপুর ১২টা থেকে অর্থমন্ত্রী তাঁর প্রথম বাজেট বক্তৃতা শুরু করবেন। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মহলের নজর থাকবে মূলত রাজস্ব বৃদ্ধি, ক্রমবর্ধমান ঋণের বোঝা সামাল দেওয়া এবং বৃহৎ শিল্প বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে কী ধরনের নীতি ঘোষণা করা হয় তার ওপর।
সাধারণত বাজেটের আগে কর বৃদ্ধির আশঙ্কা দেখা দিলেও দায়িত্ব গ্রহণের পরই স্বপন দাশগুপ্ত স্পষ্ট জানিয়েছিলেন যে রাজ্যের নিজস্ব কর রাজস্ব বৃদ্ধি তাঁর অন্যতম লক্ষ্য হলেও বর্তমান কর কাঠামোতে অতিরিক্ত বোঝা চাপানোর পরিকল্পনা নেই।
তাঁর বক্তব্য ছিল, শুধুমাত্র করের হার বাড়ালেই রাজস্ব বাড়ে না; অনেক ক্ষেত্রে করের হার কমিয়েও রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি করা সম্ভব। তাই নতুন কর আরোপ বা বিদ্যমান কর বৃদ্ধি নয়, বরং কর আদায়ের নতুন উৎস তৈরি করাই হবে সরকারের প্রধান লক্ষ্য।
অর্থনীতিবিদদের মতে, পশ্চিমবঙ্গের নিজস্ব রাজস্ব আদায়ের পরিসর দীর্ঘদিন ধরেই সীমিত ছিল। পূর্ববর্তী সরকারের আমলে মূলত রাজ্য পণ্য ও পরিষেবা কর (এসজিএসটি) এবং আবগারি শুল্কের ওপরই রাজস্ব আদায় নির্ভরশীল ছিল। ফলে রাজস্ব বৃদ্ধির জন্য বিকল্প উৎস তৈরি করা জরুরি হয়ে উঠেছে।
ইতিমধ্যেই অর্থমন্ত্রী রাজ্যের আবগারি শুল্ক আদায় ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনতে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। গত সপ্তাহে অর্থ দফতর একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে জানিয়েছে, মদ প্রস্তুতকারক সংস্থা, ব্রুয়ারি ও বটলিং প্ল্যান্টগুলিকে পণ্য কারখানা থেকে বের হওয়ার আগেই সমস্ত আবগারি শুল্ক অগ্রিম জমা দিতে হবে। সরকারের দাবি, এর ফলে দুর্নীতির সুযোগ কমবে এবং রাজস্ব আদায় বাড়বে।
ঋণ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও অর্থমন্ত্রীর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০২৭ সালের ৩১ মার্চের মধ্যে রাজ্যের মোট ঋণের পরিমাণ বেড়ে প্রায় ৮.১৫ লক্ষ কোটি টাকায় পৌঁছতে পারে। তুলনায় ২০১১ সালের ৩১ মার্চ, বামফ্রন্ট সরকারের শেষ বছরে এই ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ১.৯৯ লক্ষ কোটি টাকা।
অর্থনীতিবিদদের একাংশের মতে, এই বিপুল ঋণের বোঝা কমাতে রাজস্ব বৃদ্ধি এবং অনুৎপাদনশীল ব্যয় নিয়ন্ত্রণ— দুটিই প্রয়োজন। আজকের বাজেটে এ বিষয়ে কী রূপরেখা ঘোষণা করা হয়, সেদিকেও নজর থাকবে।
শিল্প বিনিয়োগ আকর্ষণের প্রশ্নেও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের প্রত্যাশা রয়েছে। শিল্প মহলের মতে, বৃহৎ বিনিয়োগ টানতে ভূমি নীতি এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (এসইজেড) সংক্রান্ত নীতিতে পরিবর্তন প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ১৯৭৬ সালের নগর ভূমি সিলিং ও নিয়ন্ত্রণ আইন বাতিল এবং শিল্পের জন্য জমি সংগ্রহে সরকারের সক্রিয় ভূমিকা নিশ্চিত করা হলে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়তে পারে। বর্তমানে বৃহৎ শিল্প প্রকল্পের জন্য জমি সংগ্রহের দায়িত্ব বিনিয়োগকারীদের ওপর থাকায় অনেক সংস্থা পশ্চিমবঙ্গে বিনিয়োগে অনাগ্রহ দেখিয়েছে।
একইসঙ্গে, রাজ্যের বর্তমান ‘নো স্পেশাল ইকোনমিক জোন’ নীতি তথ্যপ্রযুক্তি ও পরিষেবা খাতে নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাধা হিসেবে কাজ করছে বলেও শিল্প মহলের অভিমত।
ফলে অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্তের প্রথম বাজেট শিল্পনীতি, ভূমি সংস্কার, রাজস্ব বৃদ্ধি এবং ঋণ ব্যবস্থাপনা— এই চারটি ক্ষেত্রেই কতটা স্পষ্ট দিশা দেখাতে পারে, সেদিকেই নজর থাকবে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মহলের।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন অর্থ প্রতিমন্ত্রী (স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত) চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য অন্তর্বর্তীকালীন (ভোট-অন-অ্যাকাউন্ট) বাজেট পেশ করেছিলেন। বিধানসভা নির্বাচনের কারণে তখন পূর্ণাঙ্গ বাজেট উপস্থাপন করা সম্ভব হয়নি। নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর নতুন সরকার গঠিত হওয়ায় এবার প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট পেশ করা হচ্ছে।



















