ইম্ফল, ১১ জুন (আইএএনএস): ছয় নাগা সাধারণ নাগরিককে অপহরণ ও হত্যার ঘটনায় প্রতিবাদ জানিয়ে ডাকা ২৪ ঘণ্টার সর্বাত্মক বন্ধে বৃহস্পতিবার মণিপুরের নাগা অধ্যুষিত এলাকাগুলিতে জনজীবন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়। বন্ধের ডাক দেয় নাগা সম্প্রদায়ের শীর্ষ সংগঠন ইউনাইটেড নাগা কাউন্সিল (ইউএনসি)।
ইউএনসি-র ডাকা বন্ধ বৃহস্পতিবার সকাল ৬টা থেকে শুক্রবার সকাল ৬টা পর্যন্ত কার্যকর রয়েছে। গত ১৩ মে বিভিন্ন উপজাতীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর হাতে অপহৃত ছয় নাগা গ্রামবাসীর হত্যার প্রতিবাদে এই কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।
বুধবার কাংপোকপি জেলা জেলার সাইতু-গামফাজোল উপবিভাগের খারাম ভাইফেই গ্রামের কাছে একটি বনাঞ্চল থেকে ওই ছয় জনের বিকৃতদেহ উদ্ধার হয়। খারাম ভাইফেই মূলত কুকি-জো অধ্যুষিত এলাকা।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, বন্ধের জেরে দিনভর দোকানপাট ও বাজার বন্ধ ছিল। সরকারি ও বেসরকারি অফিস, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং আর্থিক সংস্থাগুলিও কার্যত অচল হয়ে পড়ে। রাস্তায় ব্যক্তিগত ও যাত্রীবাহী যানবাহনের চলাচলও ছিল খুবই সীমিত।
ইউএনসি নাগরিকদের শান্তিপূর্ণভাবে বন্ধ পালনের আহ্বান জানিয়ে জানিয়েছে, নিহতদের পরিবার ন্যায়বিচার না পাওয়া পর্যন্ত নাগা সমাজের পাশে থাকার বার্তা দিতেই এই কর্মসূচি।
সংগঠনটি আরও ঘোষণা করেছে, তাদের চার দফা দাবি পূরণ এবং ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা না মিললে নিহত ছয় নাগা গ্রামবাসীর মরদেহ গ্রহণ করা হবে না।
ইউএনসি-র অন্যতম প্রধান দাবি হল কুকি জঙ্গি সংগঠনগুলির সঙ্গে সরকারের সাসপেনশন অব অপারেশনস চুক্তি বাতিল করা এবং ১৩ মে লেইলন ভাইফেই গ্রাম থেকে দুই পাদরিসহ ১৮ জন নাগা নাগরিককে অপহরণ ও পরবর্তীতে ছয় জনকে হত্যার ঘটনায় জড়িত বলে অভিযোগ ওঠা কুকি জাতীয় ফ্রন্ট-এর সদস্যদের অবিলম্বে গ্রেফতার ও বিচার নিশ্চিত করা।
ঘটনার তীব্র নিন্দা করেছেন মণিপুরের মুখ্যমন্ত্রী ইউমনাম খেমচাঁদ সিং, নাগাল্যান্ডের মুখ্যমন্ত্রী নেইফিউ রিও, মেঘালয়ের মুখ্যমন্ত্রী কনরাড কে. সাংমা এবং মণিপুরের উপমুখ্যমন্ত্রী নেমচা কিপগেন-সহ একাধিক সংগঠন ও বিশিষ্ট ব্যক্তি।
মুখ্যমন্ত্রী কেমচাঁদ সিংহ এর আগেই জানিয়েছিলেন, ছয় নাগা গ্রামবাসীর অপহরণ এবং একই দিনে কাংপোকপি জেলায় তিন গির্জা নেতার হত্যার ঘটনাগুলির তদন্তভার জাতীয় তদন্ত সংস্থা (এনআইএ)-এর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।
উল্লেখযোগ্যভাবে, ছয় নাগা নাগরিকের দেহ উদ্ধারের কয়েক ঘণ্টা আগেই প্রায় চার সপ্তাহ ধরে বন্দি থাকা ১৪ কুকি গ্রামবাসী মুক্তি পান।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, মঙ্গলবার সেনাপতি জেলার একটি থানায় ওই ১৪ কুকি নাগরিককে ইউএনসি এবং নাগা জনগণের সংগঠন (এনপিও)-র প্রতিনিধিরা পুলিশের হাতে তুলে দেন।
১৩ মে-র সহিংস ঘটনার পর কাংপোকপি ও সেনাপতি জেলায় কুকি ও নাগা সম্প্রদায়ের অন্তত ৫০ জনকে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী জিম্মি করে বলে অভিযোগ। ওই দিন কাংপোকপিতে তিন গির্জা নেতা নিহত এবং আরও চার জন আহত হন।
প্রশাসন, সমাজনেতা ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের উদ্যোগে ১৪ ও ১৫ মে নাগা ও কুকি— দুই সম্প্রদায়ের প্রায় ৩০ জনকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল। এরপর থেকেই অপহৃত ছয় নাগা ও ১৪ কুকি নাগরিকের নিরাপদ মুক্তির দাবিতে উভয় সম্প্রদায়ের বিভিন্ন সংগঠন আন্দোলন চালিয়ে আসছিল।
এদিকে, বৃহস্পতিবার মণিপুর পুলিশের এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে যে সাম্প্রতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে গোয়েন্দা সূত্রে খবর মিলেছিল, পাহাড়ি জেলার বিচ্ছিন্ন গ্রামগুলিতে হামলার পরিকল্পনা করছে কিছু সশস্ত্র গোষ্ঠী।
এর ভিত্তিতে উখরুল জেলার হোরেই কাপফুং পাহাড় (লোয়ার লেইশান রিজ) এলাকায় যৌথ অভিযান চালায় নিরাপত্তাবাহিনী।
পুলিশ জানিয়েছে, অভিযানের সময় পাহাড়ের চূড়ায় প্রায় এক ডজন সশস্ত্র ব্যক্তিকে দেখা যায়। তাদের মধ্যে কয়েক জন পালিয়ে গেলেও আট জনকে আটক করে নিরস্ত্র করা হয়। পরে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়ে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
অভিযানে পাহাড়চূড়ায় তৈরি অবৈধ বাঙ্কারগুলি থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র, গোলাবারুদ এবং যুদ্ধসামগ্রী উদ্ধার হয়েছে বলেও জানানো হয়েছে।
মণিপুর পুলিশ জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত সমস্ত সম্প্রদায় ও ঝুঁকিপূর্ণ গ্রামগুলির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভবিষ্যতেও এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।



















