নয়াদিল্লি, ৯ জুন (আইএএনএস): ১০ জুন টানা ৪,৩৯৯ দিন প্রধানমন্ত্রী পদে থেকে ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর ৪,৩৯৮ দিনের রেকর্ড ভেঙে দেশের দীর্ঘতম সময় ধরে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইতিহাস গড়তে চলেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তাঁর ১২ বছরের শাসনকালে জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ভারতের নিরাপত্তা নীতিতে বড় পরিবর্তন এনেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী মোদি জাতীয় নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেন। প্রথমদিকে দেশীয় জঙ্গি সংগঠনগুলির বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চালিয়ে ‘ইন্ডিয়ান মুজাহিদিন’-এর মতো সংগঠনগুলিকে কার্যত নিষ্ক্রিয় করা হয়। এরপর নজর দেওয়া হয় জম্মু ও কাশ্মীরের বিচ্ছিন্নতাবাদী ও জঙ্গি কার্যকলাপের দিকে।
কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলির তদন্তে পাকিস্তান-সমর্থিত অর্থসাহায্যের নেটওয়ার্কের সন্ধান মেলে। তদন্তে উঠে আসে, কাশ্মীরে অশান্তি সৃষ্টির জন্য যে অর্থ পাঠানো হত, তার বড় অংশই বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতাদের ব্যক্তিগত বিলাসিতার পেছনে ব্যয় হত। জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (এনআইএ) এবং এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি) এই আর্থিক নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়ার পর বিচ্ছিন্নতাবাদী কার্যকলাপ ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে।
এদিকে নিরাপত্তা বাহিনী হিজবুল মুজাহিদিনের শীর্ষ জঙ্গি নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করে। সংগঠনের অন্যতম মুখ বুরহান ওয়ানির মৃত্যুর পর ধারাবাহিক অভিযানে একাধিক শীর্ষ জঙ্গি নিহত হয় এবং সংগঠনটি কার্যত ভেঙে পড়ে।
২০১৯ সালে সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের মাধ্যমে জম্মু ও কাশ্মীরকে সম্পূর্ণভাবে ভারতের সাংবিধানিক কাঠামোর আওতায় আনা হয়। কেন্দ্রের দাবি, এর ফলে নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে এবং পর্যটন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি এসেছে।
২০১৬ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর উরিতে সেনা শিবিরে জঙ্গি হামলায় ১৯ জন জওয়ান নিহত হন। এর ১১ দিনের মধ্যেই ভারতীয় সেনার প্যারা স্পেশাল ফোর্সেস নিয়ন্ত্রণরেখা পেরিয়ে পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরে জঙ্গি ঘাঁটিতে অভিযান চালায়। ‘উরি সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ নামে পরিচিত ওই অভিযানে একাধিক লঞ্চপ্যাড ধ্বংস করা হয়।
এরপর ২০১৯ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি পুলওয়ামায় জইশ-ই-মহম্মদের আত্মঘাতী হামলায় ৪০ জন সিআরপিএফ জওয়ান শহিদ হন। জবাবে ভারত বালাকোটে জইশের প্রশিক্ষণ শিবিরে বিমান হামলা চালায়।
সরকারি সূত্রের দাবি, এই সব পদক্ষেপে কঠোর অবস্থান নেওয়া হলেও পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের পরিস্থিতি এড়িয়ে চলার বিষয়েও সতর্ক ছিল ভারত।
২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল পহেলগামের বৈসরন উপত্যকায় জঙ্গি হামলায় ২৬ জন পর্যটক নিহত হওয়ার পর পরিস্থিতি নতুন মোড় নেয়। তদন্তকারীদের মতে, হামলার আগে জঙ্গিরা পর্যটকদের ধর্মীয় পরিচয় যাচাই করেছিল। এই ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়।
এরপর ভারত ঘোষণা করে যে পাকিস্তান-সমর্থিত ভবিষ্যতের যে কোনও জঙ্গি হামলাকে আর শুধু সীমান্ত-পার সন্ত্রাসবাদ হিসেবে নয়, বরং ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সমতুল্য বলে বিবেচনা করা হবে।
এই নতুন অবস্থানের পর ২০২৫ সালের ৭ থেকে ৯ মে রাতে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী ‘অপারেশন সিঁদুর’ পরিচালনা করে। নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় পাকিস্তান ও পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরের নয়টি জঙ্গি প্রশিক্ষণ শিবির ধ্বংস করা হয় বলে দাবি করা হয়। এর মধ্যে ছিল জইশ-ই-মহম্মদের বাহাওয়ালপুর সদর দফতর এবং লস্কর-ই-তইবার মুরিদকে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র।
সরকারি সূত্রের মতে, অপারেশন সিঁদুর ভারতের নিরাপত্তা নীতিতে একটি বড় পরিবর্তনের প্রতীক। এর মাধ্যমে শুধু জঙ্গি পরিকাঠামোকে আঘাত করা হয়নি, বরং পাকিস্তানের পারমাণবিক হুমকির কার্যকারিতাকেও চ্যালেঞ্জ জানানো হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী মোদির ১২ বছরের শাসনকালে জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত এই পদক্ষেপগুলিকেই ভারতের নতুন নিরাপত্তা মতবাদের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।



















