উদয়পুর, ৩০ মে : দীর্ঘদিনের দাবি এবং সাংস্কৃতিক জগতের শিল্পী-সাহিত্যিকদের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে নির্মিত হয়েছিল উদয়পুরের রাজর্ষি কলাক্ষেত্র। জেলার সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠা এই অডিটোরিয়াম আজ চরম অবহেলা ও অযত্নের শিকার বলে অভিযোগ উঠেছে। উদ্বোধনের এক দশকেরও কিছু বেশি সময়ের মধ্যে রাজর্ষি কলাক্ষেত্রের বর্তমান বেহাল চিত্র নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শিল্পী মহল, সংস্কৃতিপ্রেমী নাগরিক এবং স্থানীয় বাসিন্দারা।
জানা যায়, ২০১০ সালের ৪ অক্টোবর তৎকালীন সরকারের উদ্যোগে রাজর্ষি কলাক্ষেত্র নির্মাণের কাজ শুরু হয়। পরবর্তীতে ২০১৪ সালের ৬ সেপ্টেম্বর তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এই সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের উদ্বোধন করেন। জেলার শিল্প-সংস্কৃতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করার উদ্দেশ্যে নির্মিত এই পরিকাঠামো বর্তমানে নানা সমস্যায় জর্জরিত।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কলাক্ষেত্রের ছাদে আগাছা জন্মে জঙ্গলময় পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘদিন রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ভবনের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জলের ট্যাংকিতে নিয়মিত জল সরবরাহ নেই, শৌচালয়গুলি ব্যবহার অনুপযোগী অবস্থায় রয়েছে। দর্শকদের জন্য থাকা আসনগুলির অনেকই ভাঙাচোরা। কেন্দ্রীয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে বিকল হয়ে পড়ে আছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিভ্রাট মোকাবিলার জন্য থাকা জেনারেটরও অচল অবস্থায় রয়েছে বলে অভিযোগ।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, হল ভাড়া নিয়ে অনুষ্ঠান আয়োজনকারীরাও ন্যূনতম পরিষেবা পাচ্ছেন না। কলাক্ষেত্রের নিজস্ব মাইক্রোফোন ও অন্যান্য প্রযুক্তিগত সরঞ্জামের অধিকাংশই অকেজো হয়ে পড়ায় অনুষ্ঠান আয়োজকদের অতিরিক্ত খরচ করে বাইরে থেকে সরঞ্জাম ভাড়া আনতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণেও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন আয়োজকরা।
এদিকে কলাক্ষেত্রের আশেপাশের নিকাশি ব্যবস্থার অবস্থাও অত্যন্ত শোচনীয়। অভিযোগ, দীর্ঘদিন ড্রেন পরিষ্কার না হওয়ায় নোংরা জল জমে পরিবেশ দূষণের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সামগ্রিক নাগরিক পরিষেবার অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ফলে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বরাদ্দ অর্থ কোথায় ব্যয় হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সচেতন নাগরিকরা।
শুধু কলাক্ষেত্রই নয়, উদয়পুর শহরের নাগরিক পরিষেবা নিয়েও অসন্তোষ বাড়ছে। শৌচালয় পরিষ্কারের কাজে ব্যবহৃত সেস গাড়িটি দীর্ঘদিন ধরে অচল অবস্থায় পড়ে রয়েছে বলে অভিযোগ। ডাম্পিং স্টেশনের অভাবে গাড়িটি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের অতিরিক্ত ব্যয় করে দূরবর্তী অমরপুর থেকে পরিষেবা নিতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে পৌর প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও উঠছে একাধিক প্রশ্ন।
উল্লেখ্য, উদয়পুরে বড় আকারের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য বিকল্প কোনও আধুনিক হল নেই। ফলে জেলার অধিকাংশ সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও শিক্ষামূলক কর্মসূচি রাজর্ষি কলাক্ষেত্রকে কেন্দ্র করেই অনুষ্ঠিত হয়। তাই এই অডিটোরিয়ামের বর্তমান বেহাল অবস্থা শিল্পী, সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিকর্মীদের মধ্যে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
সংস্কৃতিপ্রেমী নাগরিকদের দাবি, অবিলম্বে উদয়পুর পৌর পরিষদ এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে সক্রিয় ভূমিকা নিয়ে রাজর্ষি কলাক্ষেত্রের সংস্কার, আধুনিকীকরণ ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি জেলার জনপ্রতিনিধি ও মন্ত্রীদের হস্তক্ষেপে দ্রুত সমস্যার সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ারও দাবি জানানো হয়েছে।
এখন উদয়পুরবাসীর একটাই প্রশ্ন, জেলার সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র রাজর্ষি কলাক্ষেত্র কি অবহেলার কারণে ধীরে ধীরে ধ্বংসের মুখে এগিয়ে যাবে, নাকি সময় থাকতে প্রশাসন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে তার হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনবে?



















