ত্রিপুরায় বিধানসভা নির্বাচনে সংকল্প পত্রে মাস্টার স্ট্রোক বিজেপি-র, প্রকাশ করলেন জে পি নাড্ডা

আগরতলা, ৯ ফেব্রুয়ারি(হি. স.) : ত্রিপুরায় বিধানসভা নির্বাচনে ইস্তেহারের প্রকাশের মাধ্যমে মাস্টার স্ট্রোক দিয়েছে বিজেপি। বালিকা সমৃদ্ধি স্কিমে কন্যা সন্তান জন্মালে ৫০ হাজার টাকার বন্ড, মেধাবী কলেজ ছাত্রীদের স্কুটি প্রদান সহ পরিকাঠামো ও অর্থনৈতিক বিকাশে ঢালাও বিনিয়োগের ঘোষণা রয়েছে বিজেপির সংকল্প পত্রে।

তেমনি, অনুকূলচন্দ্র ক্যান্টিনে দিনে তিনবার ৫ টাকায় খাবার, প্রধান সমাজপতিদের ভাতা বাড়িয়ে ৫ হাজার টাকা সহ পিএম কিষাণ যোজনায় রাজ্যের তরফে অতিরিক্ত ২ হাজার টাকা এবং মত্স্যজীবীদের বার্ষিক ৬ হাজার টাকা সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিজেপি।

সর্বোপরি প্রস্তাবিত ১২৫তম সংবিধান সংশোধনী বিলের এক্তিয়ারের মধ্যে এডিসিকে বৃহত্তর স্বায়ত্তশাসন এবং অতিরিক্ত আইনি, নির্বাহী, প্রশাসনিক এবং আর্থিক ক্ষমতা প্রদানের লক্ষ্যে পুনর্গঠনের সংকল্প ঘোষণা করেছে পদ্ম শিবির। আজ বিজেপির সর্ব ভারতীয় সভাপতি জে পি নাড্ডা বিজেপির সংকল্প পত্র প্রকাশ করে বলেন, ২০১৮ সালে যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিজেপি তার অতিরিক্ত কাজ করে দেখিয়েছে। তাই, সংকল্প পত্রের সমস্ত প্রতিশ্রুতি পূরণ করা হবে ত্রিপুরার মানুষ অবশ্যই তা বিশ্বাস করবে।

এদিন বিজেপির ইস্তেহার কমিটির চেয়ারম্যান ডা: অশোক সিনহা বলেন, সংকল্প পত্র-২০২৩ আদতে ত্রিপুরাবাসীর ইচ্ছা, স্বপ্ন ও আকাঙ্খার প্রতিচ্ছবি। এই সংকল্প পত্র তৈরিতে হাজার হাজার মানুষের পরামর্শ সংগ্রহ করা হয়েছে। ওই সমস্ত ভিত্তিতেই সংকল্প পত্র তৈরি হয়েছে। তাঁর দাবি, সমাজের সকল শ্রেণীর মানুষের চাহিদা পূরণ করাই বিজেপির মূল উদ্দেশ্য। তাই, শিক্ষা থেকে শুরু করে ব্যবসা বাণিজ্য, নিরাপত্তা, সশক্তিকরণ এবং সমৃদ্ধি সুনিশ্চিত পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

এদিকে, মুখ্যমন্ত্রী অধ্যাপক ডা: মানিক সাহা দাবি করেন, অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মতো ইস্তেহারে প্রকাশ নামকাওয়াস্তে করে না বিজেপি। প্রত্যেকটি বিষয়ে বিজেপি গুরুত্ব দিয়ে থাকে, তেমনি ইস্তেহার নিয়েও দল ভীষণ সংবেদনশীল তা ইতিমধ্যেই প্রমাণিত হয়েছে। তিনি বলেন, নির্বাচনের হাতেগুনা কয়েক দিন বাকি রয়েছে। সকলে মিলে ঝাপিয়ে পড়ুন।

আজ বিজেপির সংকল্প পত্র প্রকাশ করে দলের সর্ব ভারতীয় সভাপতি জে পি নাড্ডা অতীত এবং ভবিষ্যতের সাথে যোগসূত্র বেঁধে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তিনি বলেন, ২০১৮ সালে প্রতিশ্রুতি পুরণেই থেমে থাকেনি বিজেপি। ওই সংকল্প পত্রে উল্লেখ ছিল না এমন বহু কাজ মানুষের কল্যাণে করা হয়েছে। তাঁর দাবি, ১৫টি একলব্য স্কুল, বিশ্ব ব্যাংক থেকে ১৩০০ কোটি টাকার প্রকল্প, ত্রিপুরায় ৩৭ হাজার ব্রু জনজাতির স্থায়ী পুনর্বাসন এবং গৌতম বুদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন সংকল্প পত্রে ছিল না। কিন্তু, জনকল্যাণে ঘোষণার বাইরে বিজেপি কাজ করেছে।

সাথে তিনি ২০১৮ সালে সংকল্প পত্রে ঘোষণার বাস্তবায়নের রিপোর্ট কার্ড তুলে ধরেছেন। তাঁর দাবি, বিজেপি দেশের মধ্যে একমাত্র দল রিপোর্ট কার্ড হাতে মানুষের দরবারে হাজির হওয়ার ক্ষমতা রাখে। তিনি বলেন, প্রত্যেককে ঘর, পানীয় জল, সামাজিক ভাতা বৃদ্ধি, সহায়ক মূল্যে ধান ক্রয় সহ বহু সংকল্পের সফল বাস্তবায়ন হয়েছে। তাতে প্রমাণিত, আগামী পাঁচ বছরের জন্য নেওয়া সংকল্পও পূরণ করবে বিজেপি।

এদিন তিনি সংকল্প পত্রের মুখ্য কিছু বিষয় সকলের কাছে তুলে ধরেছেন। তাঁর কথায়, বালিকা সমৃদ্ধি স্কিমে কন্যা জন্মের জন্য আর্থিকভাবে দুর্বল অংশের পরিবারকে ৫০ হাজার টাকার বন্ড দেওয়া হবে। মেধাবী কলেজ ছাত্রীদের বিনামূল্যে সকুটি প্রদান করা হবে। শুধু তাই নয়, পিএম উজ্জ্বলা যোজনায় সমস্ত সুবিধাভোগীদের ২টি এলপিজি সিলিন্ডার বিনামূল্যে দেওয়া হবে।

তেমনি, সকল যোগ্য ভূমিহীন নাগরিকদের জমির পাট্টা বিতরণ, ২০২৫ সালের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা গ্রামীণ এবং শহরের সমস্ত নথিভুক্ত সুবিধাভোগীদের জন্য সুলভ মূল্যের আবাসন তৈরি ও অনুকূলচন্দ্র ক্যান্টিনে দিনে তিনবার ৫ টাকা দিয়ে প্রতি প্লেট খাবারের ব্যবস্থা করা হবে, জানান তিনি।

সাথে তিনি যোগ করেন, পিডিএস সুবিধাভোগীদের জন্য প্রতি মাসে বিনামূল্যে চাল ও গম এবং বছরে চারবার ভর্তুকি দরে ভোজ্য তেল সরবরাহ, প্রস্তাবিত ১২৫-তম সংবিধান সংশোধনী বিলের এক্তিয়ারের মধ্যে এডিসি-কে বৃহত্তর স্বায়ত্তশাসন এবং অতিরিক্ত আইনি, নির্বাহী, প্রশাসনিক এবং আর্থিক ক্ষমতা প্রদানের লক্ষ্যে পুনর্গঠন, ত্রিপুরা জনজাতি বিকাশ যোজনা – তফসিলি জনজাতি পরিবারকে বার্ষিক ৫ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা এবং উপজাতীয় সংস্কৃতি ও অধ্যয়নের গবেষণা, প্রচার ও সংরক্ষণের জন্য গন্ডাছড়ায় মহারাজা বীর বিক্রম মাণিক্য উপজাতি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার সকল্প নিয়েছে বিজেপি।

তেমনি, প্রধান সমাজপতিদের সম্মানী ভাতা প্রতি মাসে ২ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ হাজার টাকা, পিএম কিষাণ যোজনার আওতায় প্রতি বছর ৬ হাজার টাকা থেকে ৮ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা বৃদ্ধি এবং ভূমিহীন কিষাণ বিকাশ যোজনার আওতায় সমস্ত ভূমিহীন কৃষকদের প্রতি বছর ৩ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা প্রদান ও মৎস্য সহায়ক যোজনায় সমস্ত জেলেকে বার্ষিক ৬ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা করার সংকল্পের ঘোষণা দিয়েছে বিজেপি, বলেন তিনি।

প্রসঙ্গত, ত্রিপুরায় জনজাতিদের উন্নয়ন হয়নি দাবি করে হওয়া গরম করে তুলেছে তিপরা মথা। সাংবিধানিক অধিকার আদায়ের ডাক দিয়ে প্রদ্যোত কিশোর প্রচারে দারুন সাড়া ফেলেছেন। তাঁর দলের সংকল্প পত্রেও দারুন চমক লক্ষ্য করা গিয়েছে। কিন্তু, আজ বিজেপির সংকল্প পত্রে তিপরা মথাকে নির্বাচনে হোঁচট খেতে হবে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।

বিজেপি সংকল্প পত্রে সাফ উল্লেখ করেছে, ত্রিপুরার আঞ্চলিক অখণ্ডতা এবং সার্বভৌমত্বকে বজায় রেখে সমস্ত সাংবিধানিক, আইনি, নির্বাহী এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এই ঐতিহাসিক স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান করা হবে। শুধু তাই নয়, ১২৫তম সংবিধান সংশোধনী বিলে দলত্যাগ বিরোধী আইনের বিধানগুলি সুপরিকল্পিতভাবে প্রয়োগ করা হবে।

তেমনি, এডিসির অন্তর্গত এলাকায় জনসংখ্যার অনুপাতে বাজেট বরাদ্দ এবং সামগ্রিক ঊনয়নের লক্ষ্যে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সেই তহবিল স্থানান্তরিত করার সংকল্প নিয়েছে বিজেপি। পাশাপাশি, কাউন্সিলের কাছে কেন্দ্রের প্রকল্প সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলি সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে পাঠানোর ক্ষমতা দেওয়া নিশ্চিত করা হবে। এছাড়াও আরও বিভিন্ন বিষয়কে সংকল্প পত্রে অন্তর্ভুক্ত করে বিজেপি আজ মাস্টার স্ট্রোক দিয়েছে বলে দাবি রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলের।