শুভঙ্কর দাস
ভারতের মতন তৃতীয় বিশ্বের দেশে স্কুল শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। স্বাধীনতার পর থেকে এখনও পর্যন্ত স্কুল শিক্ষার মাধ্যমে সর্বশিক্ষার স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করার জন্য নিরন্তন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে গড়ে উঠেছে সরকারি স্কুল। বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের বাড়বাড়ন্ত থাকলেও এখনো এর ব্যাপ্তি বিস্তার করা প্রয়োজন। অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনে এবং জা দ্রেজের মতে রাষ্ট্র তার অনুৎপদক খরচ কমিয়ে শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বরাদ্দ বেশি করবে। দেশের নিম্নমধ্যবিত্ত এবং দারিদ্র সীমার নিচে বসবাসকারীদের কাছে আজও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্কুল শিক্ষা ব্যবস্থা।
এই প্রসঙ্গে আলোকপাত করতে গিয়ে মধ্যশিক্ষা পর্ষদের প্রাক্তন সভাপতি হরপ্রসাদ সমাদ্দার জানিয়েছেন, পেট আগে না মাথা। এই দুয়ের দ্বন্দ্ব এখনো সমাজে রয়েছে। শিক্ষা না খাদ্য। এর স্থায়ী কোনো সমাধান এখনো বের করা যায়নি। মিড ডে মিলের পদক্ষেপ ভাল হলেও তা কোনওভাবেই এর পূর্ণাঙ্গ সমাধান করতে পারেনি। বিভিন্ন পরিবার থেকে উঠে আসা প্রথম প্রজন্মের পড়ুয়াদের মধ্যে স্কুল ছুট এর পরিমান বেশি লক্ষ্য করা যায়। কোনমতে তারা এই পর্যন্ত পড়ে রুটিরুজি টানে বেরিয়ে পড়ে। মধ্যবিত্তের কাছে মিড ডে মিলের গুরুত্ব না হলেও দরিদ্র সীমার নিচে বসবাসকারী পড়ুয়াদের মধ্যে এর গুরুত্ব অপরিসীম। পরিবারে মা যদি শিক্ষিত হয় তবে ছেলে মেয়ে অশিক্ষিত থাকতে পারে না।
শহরাঞ্চলে স্কুলগুলিতে পড়ুয়াদের সংখ্যা কমে যাওয়া প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে হরপ্রসাদ বাবু জানিয়েছেন যে তিনি নিজে যখন মধ্যশিক্ষা পর্ষদের সভাপতি ছিলেন সেই সময় প্রায় ৮০ শতাংশ স্কুলের অনুমোদন বাতিল করে দিয়েছিলেন। এর মূল কারণ ছিল স্কুলগুলির মধ্যে পড়ুয়া না থাকা। তার মতে বর্তমান সময়ে স্কুলছুটের পরিমাণ কমিয়ে আনাটাই মূল চ্যালেঞ্জ। বাড়ির মধ্যে পড়ার পরিবেশ প্রথম প্রজন্মের পড়ুয়াদের মধ্যে গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি তাদের সুষম আহার বন্দোবস্ত না করলে লেখাপড়ায় মন বসাতে অসুবিধা হতে পারে। সর্বোপরি শিক্ষার যে কোন স্তরে শৃঙ্খলাপরায়নতা থাকাটা জরুরী। না হলে শিক্ষা গ্রহণে অনীহা তৈরি হবে। ভারতীয় মূল্যবোধ নীতি শিক্ষা প্রদান করতে হবে। যদিও কেন্দ্রের নতুন শিক্ষানীতিকে মানতে রাজি নন হরপ্রসাদ বাবু।
হুগলি জেলার তেলিনিপাড়া ভদ্রেশ্বর উচ্চ বিদ্যালয়ের ইতিহাসের শিক্ষক বিভাস ঘোষাল জানিয়েছেন, বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় সেকেলে ভাব রয়ে গিয়েছে। সময়ের চাহিদা মেনে চলাটা জরুরি। প্রতিদিন নতুন দিক খুলে যাচ্ছে। এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিক্ষায় প্রযুক্তির ব্যবহার আনাটা প্রয়োজন। যে সকল পড়ুয়া লেখাপড়ার থেকে হাতের কাজ শিখতে বেশি উৎসাহী তাদেরকে সপ্তম এবং অষ্টম শ্রেণীর পর সেই শিক্ষায় শিক্ষিত করার প্রয়োজন। পড়ুয়াদের মধ্যে আত্মমর্যাদাবোধ গড়ে তোলা জরুরি। দরিদ্রদের মধ্যে আত্মসম্মানবোধ রয়েছে। কিন্তু বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় পড়ুয়াদের মধ্যে পরনির্ভরশীলতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অষ্টম শ্রেণী পেরিয়ে নবম শ্রেণীতে উঠে আসা বহু পড়ুয়াই এখনো নিজের ভাষায় গুছিয়ে লিখতে পারছে না। প্রতিটা ক্ষেত্রে মুখস্ত করে তাদেরকে চলতে হচ্ছে। পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাশ ফেল না থাকায়। বাড়িতে পড়াশোনা ন্যূনতম উৎসাহ প্রদানের অভাবে পড়ুয়াদের মধ্যে গা ছাড়া ভাব দেখা যাচ্ছে। ইংরেজি মাধ্যমে স্কুলগুলিতে পঠন পাঠনের কঠোরতা আছে বলেই পড়ুয়ারা সেখানে শিখতে পারছে। কিন্তু বাংলা মাধ্যমের স্কুলগুলিতে ব্যতিক্রমী কয়েকটি বাদ দিলে পড়ুয়াদের মধ্যে মোটিভেশন এর অভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ফলে তারা স্কুল এবং টিউশনে গিয়ে শিখতে পারছে না। শিক্ষাব্যবস্থায় ফাঁকিবাজি সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। নতুন শিক্ষানীতি হয়তো এই ফাঁকিবাজি দূর করতে পারবে।
উল্লেখ করা যেতে পারে স্বাধীনতার প্রায় সাতটি দশকেরও বেশি সময় আমরা পেরিয়ে এসেছি। এমন পরিস্থিতিতে উচ্চশিক্ষার ভিত গঠনে স্কুল শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়াটা একান্তভাবে প্রয়োজন। প্রত্যেক পড়ুয়ারা যাতে সমান পড়ার পরিবেশ পায় সেই দিকটি দেখতে হবে প্রশাসনকে।



















