শুভঙ্কর দাস
স্বাধীনতার পর পেরিয়ে গিয়েছে সাত দশকেরও বেশি সময়। উচ্চশিক্ষায় বিশেষ করে স্নাতকস্তরে শিক্ষার প্রসার ও প্রচারে কতদূর এগিয়েছে ভারত, তা নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে।তবে বিভিন্ন উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলেছে ভারতের স্নাতকস্তরের শিক্ষাব্যবস্থা।কলেজে এসেই দেশের সিংহভাগ পড়ুয়া উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। এদের মধ্যে বহু পড়ুয়াই রয়েছে যারা স্নাতক হওয়ার পর স্নাতকোত্তরে না গিয়ে কর্মসংস্থানে উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ে। ফলে সবদিক দিয়েই কলেজ শিক্ষার মাহাত্ম্য অপরিসীম বলে মনে করেন শিক্ষাবিদরা। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক তরুণ নস্কর জানিয়েছেন, স্বাধীনতার সময় থেকে বৈজ্ঞানিক মনস্ক শিক্ষা এবং সার্বজনীন শিক্ষার দাবিতে সেই সময় সরব হয়েছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের মতন ব্যক্তিত্বরা। দেশের শিক্ষা পরিকাঠামো গড়ে তোলার জন্য সেই সময় স্বাধীনতা সংগ্রামীরা গড়ে তুলেছিলেন জাতীয় শিক্ষা পরিষদ।
এই সংগঠনের সঙ্গে নাম জড়িয়ে রয়েছে অরবিন্দ ঘোষের।জাতীয় শিক্ষা পরিষদই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলে। স্বাধীনতার পরও আশা প্রকাশ করা হয়েছিল যে শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ বাড়াবে সরকার। সকলের জন্য শিক্ষার অধিকার রক্ষার্থে এই পদক্ষেপ নেবে প্রশাসন। দিন যত গিয়েছে শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ কমেছে। সরকারের একাধিক কমিশন সুপারিশ করেছিল যে কেন্দ্রীয় বাজেটের দশ শতাংশ শিক্ষাখাতে বরাদ্দ করতে হবে। বর্তমান সময়ের দাবি ছিল জিডিপির ছয় শতাংশ শিক্ষাখাতের জন্য নিয়োজিত করতে হবে। কিন্তু তেমনটা হয়নি।২০১৪ সালে যেখানে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ করা হয়েছিল ০.৫৩ শতাংশ। বর্তমান সময়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে ০. ৪৪ শতাংশ। সেই কারণেই উচ্চ শিক্ষায় বেসরকারি সংস্থাগুলি একের পর এক কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এমনকি মেডিকেল কলেজ তৈরি করে চলেছে। অবিলম্বে প্রয়োজন কলেজ শিক্ষার পরিকাঠামোকে বিপুল হারে গড়ে তোলা। স্নাতক স্তরের শিক্ষাকে সর্বজনীন করে তোলার জন্য কলেজের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে। বেসরকারি ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে স্নাতক স্তরের শিক্ষাকে আরো শক্তিশালী করার জন্য। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার হুজুক কয়েক বছর আগেও দেখা গিয়েছে এখন সেটা অনেকটাই নিম্নমুখী। বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজগুলি মশা মাছি তাড়াচ্ছে।
নতুন শিক্ষানীতিতে বেসরকারি সংস্থার বিনিয়োগ করার পরিসরকে বৃদ্ধি করা হয়েছে। যা কাম্য নয়। শিক্ষানীতি এমন করে গড়ে তুলতে হবে যাতে স্নাতক স্তরের পর্যাপ্ত শিক্ষা একজন পড়ুয়া পায়। শিক্ষা খাতে অর্থ বরাদ্দ করলেও শিক্ষা সংস্থাগুলির মাথায় শিক্ষাবিদকেই রাখতে হবে। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ মীরাতুন নাহার জানিয়েছেন, ২০০৯ সালে স্কুল শিক্ষা সার্বজনীন করে তোলার জন্য নীতি তৈরি করা হয়েছিল।কিন্তু সাংসদ, বিধায়ক, পঞ্চায়েত সদস্য হওয়ার লক্ষ্যে রাজনীতিবিদরা এতটাই ব্যস্ত যে তারা শিক্ষার বিষয়টি অবজ্ঞা করে গিয়েছে। সাংসদ, বিধায়ক হলে অর্থ উপার্জনের নিশ্চিত পথ খুলে যাবে। ফলে সেই দিকেই ছুটে চলেছে তারা। একাধিক সাংসদ এমনও রয়েছে যাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা প্রশ্নের মুখে। আগে একজন স্নাতক হয়ে বেরোলে সমাজে তার সম্মান অনেক বেশি ছিল। এখন তা ধরাতলে পতিত হয়েছে।অনলাইনের নাম করে ধীরে ধীরে একদিন কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলি বন্ধ হয়ে যাবে।কর্পোরেট সংস্থার সঙ্গে নীতিনির্ধারকরা সুপরিকল্পিতভাবে শিক্ষাব্যবস্থার অবনতি ঘটিয়েছে। প্রকৃত ইনার এডুকেশনের অভাব রয়েছে।শিক্ষার মধ্যে যে জাতির উন্নয়ন, মানুষের উন্নয়ন এবং মানব সম্পদের উন্নয়ন নিহিত সেটা ব্রাত্য থেকে যাচ্ছে।শুধু স্নাতক স্তর নয়।শিক্ষার প্রতিটি স্তরেই অক্ষয় দেখা যাচ্ছে।
উল্লেখ করা যেতে পারে স্বাধীনতা সংগ্রামে উচ্চ শিক্ষাকে সর্বজনীন করে তোলার জন্য আন্দোলন চালানো হয়েছিল। স্বাধীনতার পর কয়েক বছর সেই ভাবে চলা হলেও দিন যত গিয়েছে শিক্ষা খাতে ব্যয় বরাদ্দ কমতে শুরু। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অভাব চোখে পড়ার মতো। কর্পোরেট বিনিয়োগের ফলে উচ্চশিক্ষা ক্রমশই নাগালের বাইরে যেতে বসেছে নিম্ন মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্ত শ্রেণীর।



















