নিজস্ব প্রতিনিধি, আগরতলা, ২ মার্চ৷৷ শুধু নম্বর নয়৷ আমরা চাইছি ছেলেমেয়েরা মানুষের মতো মানুষ হিসাবে গড়ে উঠবে৷ তারা পড়বে, খেলবে, গাইবে, নাটক করবে, নাচবে কিন্তু সর্বোপরি তাদেরকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে হবে৷ আজ খয়েরপুরে পল্লীমঙ্গল উচ্চতর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নব নির্মিত দ্বিতল ভবনের দ্বারোদঘাটন অনুষ্ঠানে উদ্বোধকের ভাষণে একথা বলেন মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার৷ মুখ্যমন্ত্রী তার সুকল জীবনের স্মৃতিচারণ করে বলেন, সে সময়ে বিদ্যালয়ে পঠনপাঠনের ক্ষেত্রে এধরনের প্রাসাদোপন ভবন ছিল কল্পনাতীত৷ উদয়পুরে তাঁর প্রথম বিদ্যালয়টি ছিল একটি ফুলগাছতলায় দো’চলা বাড়ি৷ ছিলো না বসার সুব্যবস্থা৷ বিদ্যালয়ের ব্ল্যাকবোর্ড ছিল ব্যবহার অনুপযোগী৷ ডাস্টার ছিল না৷ জীর্ণ কাগজ দিয়ে ডাস্টারেরর কাজ চালানো হত৷ পানীয় জলের জন্য চাপা কল ছিল না বিদ্যালয়ে৷ গোমতী নদীর তীরে সিনিয়র বেসিক সুকল স্থানান্তরিত হবার পর নদী থেকে জল এনে যার যার শ্রেণীকক্ষে ব্যবহার করতে হত৷ এই ছিল সে সময়কার বিদ্যালয়৷ তিনি বলেন, এখন প্রাসাদের মত সুকলবাড়ি তৈরি করা হচ্ছে৷ কিন্তু সুকলবাড়ি দালানবাড়ি কিনা সেটা বড় নয়৷ আসল হচ্ছে লেখাপড়ার পরিবেশ পরিমন্ডল৷ সেটা তৈরি করার দায়িত্ব শিক্ষক শিক্ষিকাদের বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন৷ মুখ্যমন্ত্রী বলেন, আজকে যে সুযোগ সুবিধা তৈরি করা হচ্ছে তাতে বাড়ির কাছে পা বাড়ালেই সুকল৷ এক বর্গ কিলোমিটারের মধ্যেই অনেক সুকল রয়েছে৷ তিনি বলেন,
এখন কলেজ পর্যন্ত পড়াশুনা করতে বেতন লাগে না৷ অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে ছেলেমেয়েদের সব বই কিনে দেয়া হচ্ছে৷ রান্না করা খাবার দেওয়া হচ্ছে৷ দেওয়া হচ্ছে অনেক রকমের স্টাইপেন্ড৷ কোনো কোনো অংশের ছেলেমেয়েদের জুতো, জামা, বই রাখার ব্যাগ, পানীয় জলের বোতল পর্যন্ত কিনে দেওয়া হচ্ছে৷ এবারের রাজ্য বাজেটেও শিক্ষাখাতে প্রতি ১০০ টাকায় ২১ টাকা ২৩ পয়সা রাখার প্রস্তাব রয়েছে৷ মুখ্যমন্ত্রী বলেন, শিক্ষা আমাদের চরিত্র গঠনে সাহায্য করে৷ পাশাপাশি তিনি ছাত্রছাত্রীদের আবশ্যিক কতগুলি সদগুণের অধিকারী হবার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ছাত্রছাত্রীরা সত্যভাষী হবে, মিথ্যার আশ্রয় নেবে না, বয়োজ্যেষ্ঠদের শ্রদ্ধা করবে, সমবয়সীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও ছোটদের ভালবাসবে৷ তারা জাত ধর্ম বর্ণ ও সম্প্রদায় নির্বিশেষে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়াবে৷ তারা সামর্থের সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বিপন্ন মানুষকে সাহায্য করার চেষ্টা করবে৷ অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে সাহসী হবে৷ ন্যায়ের পক্ষে নির্ভীকভাবে দাঁড়াবে৷ এই বোধ যদি ছেলেমেয়েদের মধ্যে জাগ্রত না হয় তাহলে উচ্চ নম্বর নিয়ে প্রথম বিভাগে পাশ করলেও কোনো লাভ হবে না৷ তিনি বলেন, মায়েরা হলেন সন্তান সন্ততির প্রথম শিক্ষক৷ নিজের ছেলেমেয়েদের সদগুণগুলির শিক্ষা দিতে মাকেই প্রথম দায়িত্ব নিতে হবে৷ একই সঙ্গে দায়িত্ব নিতে হবে বাবাকেও৷ ছেলেমেয়েদের মানুষের মত মানুষ তৈরি করতে ঘর থেকে উদ্যোগ নিতে হবে৷ আর বিদ্যালয়ের শিক্ষক শিক্ষিকাদের তাদের উপর নজর রাখতে হবে৷ কারণ, বিদ্যালয় পাঠরত অবস্তায় ছেলেমেয়েরা থাকে কাঁচা মাটির মত৷ কুম্ভকাররা যেমন কাঁচা মাটি দিয়ে খাবারের থালা, গ্লাস সরস্বতীর মূর্তি তৈরি করে, ঠিক তেমনি আবার এই মাটি দিয়ে অসুরের মূর্তিও তৈরি করে৷ তাই মা-বাবা ও শিক্ষক -শিক্ষিকাগণকেই ঠিক করতে হবে এই কাঁচা মাটির মতো ছেলেমেয়েদের ঠিক কিভাবে গড়ে তুলবেন৷ ছেলেমেয়েরা হচ্ছে দেশের সম্পদ৷ এরাই হচ্ছে দেশের ভাবী নাগরিক৷ এদের ওপরই দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে৷ এরা যদি প্রকৃত মানুষ, সৎ মানুষ না হয় তাহলে দেশের ভবিষ্যৎ কিন্তু বিপজ্জনক দিকে চলে যাবে৷ গৃহে এবং বিদ্যালয়ে যদি মা বাবা ও শিক্ষক শিক্ষিকারা আন্তরিক হন তাহলে ঘরে ঘরে আমাদের ছেলেমেয়েরা মানুষের মত মানুষ হবে৷ হাত ধরাধরি করে এই কাজটা আমরা যদি করতে পারি, প্রকৃত অর্থে জাতির গঠনের কাজ, দেশকে এগিয়ে নেয়ার যে কাজ তাতে সার্থকতা আসবে বলে তিনি আশা ব্যক্ত করেন৷
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, শিক্ষক শিক্ষিকারা হচ্ছেন সমাজের শিক্ষক, দেশ গড়ার কারিগর৷ এটাকে ভাবনায় রেখে যদি তাঁরা নিজেদের উজাড় করে দেন তাহলেই এই কাজে আন্দ পাওয়া যাবে৷ তিনি শিক্ষক শিক্ষিকাদের সবাইকে এই আনন্দের অংশীদার হবার আহ্বান জানিয়ে বলেন, যে সকল ছেলেমেয়েদের মধ্যে সম্ভাবনা রয়েছে তাদেরকে সাহায্য করতে এবং যারা বুঝতে পারছে না তাদেরকেও আলাদাভাবে সাহায্য করতে৷ এভাবে ছেলেমেয়েদের একটার পর একটা দুর্বলতা দূর করে তাদেরকে যথার্থ সফল ছাত্রছাত্রী ও মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে ভূমিকা নিতে হবে৷ এটা করতে পারলেই এই প্রাসাদের মত বাড়ি তৈরি করার আনন্দ সঠিক অর্থে ভোগ করা যাবে বলে তিনি মন্তব্য করেন৷
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে শিক্ষামন্ত্রী তপন চক্রবর্তী বলেন, সকলের জন্য শিক্ষাই হল রাজ্য সরকারের মূল লক্ষ্য৷ রাজ্যের ছেলেমেয়েরা যাতে সঠিক শিক্ষাগ্রহণ করতে পারে তার জন্য রাজ্য সরকার চেষ্টা করছে৷ শিক্ষা ছাড়া মানবসম্পদের উন্নয়ন হতে পারে না৷ শুধু পরিকাঠামোর উন্নয়নেই শিক্ষার উন্নয়ন সম্ভব নয়৷ এজন্য সবার আগ্রহও থাকতে হবে৷ এই দুইয়ের সমন্বয়ে সার্বিক শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন ও মানব সম্পদের উন্নয়ন সম্ভব বলে তিনি মন্তব্য করেন৷
অনুষ্ঠানে সভাপতির ভাষণে বিধানসভার উপাধ্যক্ষ পবিত্র কর সার্বিক পরিকাঠামোযুক্ত এই বিদ্যালয়টি আগামী দিনে শিক্ষা, সংসৃকতি, খেলাধূলা সহ সব দিক দিয়ে আরো উৎকর্ষতা লাভ করবে বলে আশা ব্যক্ত করেন৷
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এছাড়াও বক্তব্য রাখেন বিদ্যালয় শিক্ষা দপ্তরের অধিকর্তা মৃণাল কান্তি নাথ, ত্রিপুরা হাউজিংএন্ড কনস্ট্রাকশন বোর্ড এর মুখ্য কার্যনির্বাহী আধিকারিক অমর চন্দ্র দাস প্রমুখ৷ উল্লেখ্য, পল্লীমঙ্গল সুকলের নবনির্মিত দ্বিতল ভবন নির্মাণে মোট ব্যয় হয়েছে ৮ কোটি ২৩ লক্ষ টাকা৷ এতে ৩১টি শ্রেণীকক্ষ রয়েছে৷ এছাড়াও মিড ডে মিলের জন্য অত্যাধুনিক ডাইনিং হল, টিচার্স রুম বিজ্ঞান বিভাগের ল্যাবরেটরি প্রভৃতি এই নবনির্মিত ভবনে রয়েছে৷


















