কাঠমান্ডু, ২৫ সেপ্টেম্বর (আইএএনএস): হিমালয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করতে নেপাল, ভারত ও চীনকে নিয়ে একটি ‘হিমালয়ান ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স মেকানিজম’ গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়েছেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ। বুধবার নিউইয়র্কে রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে এই প্রস্তাব দেন তিনি।
শাহের প্রস্তাবিত এই ত্রিপাক্ষিক ব্যবস্থায় স্যাটেলাইট তথ্য ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা বিনিময়, বিপজ্জনক হিমবাহ-হ্রদ পর্যবেক্ষণ এবং আঞ্চলিক আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, “বিপজ্জনক হিমবাহ-হ্রদগুলি পর্যবেক্ষণ করি। যৌথ আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করি। আর দুর্যোগ আঘাত হানলে সীমান্তের ওপারে সমন্বয়ের মাধ্যমে সহায়তা পৌঁছে দিই।”
হিমালয়কে তথ্যের বিচ্ছিন্নতার সীমান্ত নয়, বরং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পরীক্ষাগার হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানান নেপালের প্রধানমন্ত্রী।
গত ২৬ আগস্ট নেপালে ভয়াবহ বন্যায় একাধিক পার্বত্য জনপদ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার প্রসঙ্গ তুলে ধরে শাহ বলেন, এই বিপর্যয়ের তীব্রতা অনেকেই ‘মাউন্টেন সুনামি’ বা ‘হিমালয়ান সুনামি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত এই বন্যায় ১,৪৫৩ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৫,৫৫০ জন নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজদের মধ্যে ৬৩৬ জন বিদেশি নাগরিক।
বিশেষজ্ঞদের একাংশ এই বিপর্যয়কে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বলে উল্লেখ করেছেন। ভোতেকোশি ও ত্রিশূলী নদী করিডরে বন্যার ফলে বহু বসতি, সেতু ও রাস্তা ভেসে যাওয়ার পাশাপাশি স্কুল, বাড়িঘর, জীবিকা ও অন্যান্য পরিকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
শাহ জানান, নেপাল তার ভূখণ্ডের প্রায় অর্ধেক জুড়ে বনভূমি পুনরুদ্ধার করেছে। পাশাপাশি পরিচ্ছন্ন জ্বালানির চাহিদা মেটাতে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো হচ্ছে এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, নেপালে বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে এবং স্থানীয় স্তরে জলবায়ু অভিযোজন ব্যবস্থা শক্তিশালী করা হচ্ছে। ক্রমবর্ধমান জলবায়ুজনিত দুর্যোগের তীব্রতা ও ঘনত্ব মোকাবিলায় আরও পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনে নেপালের অবদান অত্যন্ত সামান্য উল্লেখ করে শাহ বলেন, বিশ্বব্যাপী গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনে নেপালের অংশ ০.১ শতাংশেরও কম। অথচ জলবায়ু সংকটের কারণে দেশটিকে বিপুল মূল্য দিতে হচ্ছে।
তাঁর কথায়, হিমবাহগুলি দ্রুত সরে যাচ্ছে, পাহাড়ের ঢাল আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে এবং নদীগুলির গতিপ্রকৃতি ক্রমশ অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। প্রতিটি বড় দুর্যোগ নেপালের বহু বছরের উন্নয়নকে পিছিয়ে দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করছে।
শাহ বলেন, নেপালের কাছে জলবায়ু বিপর্যয় শুধুমাত্র মানবিক সংকট নয়, এটি উন্নয়নেরও জরুরি সংকট। দুর্যোগে রাস্তা, সেতু, স্কুল, বাড়িঘর, কৃষিজমি ও মানুষের জীবিকা ধ্বংস হচ্ছে। ভবিষ্যতের জ্বালানি চাহিদা পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় পরিচ্ছন্ন জ্বালানি পরিকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
ন্যাশনাল প্ল্যানিং কমিশন এবং ন্যাশনাল ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অথরিটির যৌথ প্রযুক্তিগত দলের তৈরি র্যাপিড ডিজাস্টার নিডস অ্যাসেসমেন্ট বা আরডিএনএ রিপোর্ট অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বন্যায় প্রায় ২.৬৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিকাঠামো ও সম্পদের পুনর্গঠন এবং পুনরুদ্ধারের জন্য প্রায় ৪.৭৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রয়োজন হবে বলে রিপোর্টে অনুমান করা হয়েছে, যা নেপালের মোট জিডিপির প্রায় ১০ শতাংশের সমান।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি ত্রাণ ও পুনর্গঠনের পাশাপাশি দায়বদ্ধতা, ক্ষতিপূরণ এবং দীর্ঘমেয়াদি সহনশীলতার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান শাহ।
তিনি জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা উন্নয়নশীল দেশগুলির জন্য আরও বেশি অনুদানভিত্তিক আন্তর্জাতিক সহায়তার দাবি জানান। তাঁর বক্তব্য, জলবায়ুজনিত দুর্যোগে দরিদ্র দেশের পরিকাঠামো ধ্বংস হলে তার সমাধান শুধুমাত্র নতুন বড় ঋণ বা ছোট ছোট অনুদানের ওপর নির্ভর করতে পারে না।
‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড’ এবং ‘গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট ফ্যাসিলিটি’-সহ বিভিন্ন অর্থায়ন ব্যবস্থা এখনও যথেষ্ট নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। জলবায়ু অর্থায়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে জটিল আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সমালোচনা করে শাহ বলেন, বিপর্যস্ত দেশগুলিকে সাহায্যের প্রয়োজন প্রমাণ করতে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হওয়া উচিত নয়।
ভবিষ্যতে জলবায়ুজনিত চরম পরিস্থিতি আরও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করে নেপালের প্রধানমন্ত্রী বলেন, পুরনো পরিসংখ্যান ও পরিস্থিতির ভিত্তিতে আর পরিকল্পনা করা সম্ভব নয়। দুর্যোগের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে আগাম প্রস্তুতির সংস্কৃতি গড়ে তোলার ওপর জোর দেন তিনি।
জলবায়ু সহনশীল পরিকাঠামোয় বিনিয়োগ, বিমা ও উদ্ভাবনের প্রসার এবং আরও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে শাহ জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোরও ডাক দেন। পাশাপাশি এমন ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন, যা দ্রুত সতর্কবার্তা দিয়ে মানুষের জীবন রক্ষা করতে সক্ষম হবে।



















